রাষ্ট্রপতি ভবনে গ্র্যান্ড ডিনার! সুইস প্রেসিডেন্টের সামনে থালায় জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখের কোন কোন রাজকীয় পদ সাজাল ভারত?

রাষ্ট্রপতি ভবনে সোমবারের সন্ধ্যাটি কেবল সরকারি বৈঠক ও আনুষ্ঠানিক আলোচনার গণ্ডি ছাড়িয়ে এক অনন্য কূটনৈতিক এবং রন্ধনশিল্পের উৎসবে পরিণত হয়েছিল। সুইস প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিন এবং তাঁর স্ত্রী ক্যারোলিন পারমেলিনের সম্মانی আয়োজিত এই বিশেষ ভোজসভায় ভারতের হিমালয় অঞ্চলের সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় রন্ধনশৈলী আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে তুলে ধরা হয়। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর আয়োজিত এই রাজকীয় নৈশভোজের মেনুতে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখের বাছাই করা সব সুস্বাদু ও ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল।
এই আয়োজনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি ছিল, খাবারের টেবিলে কেবল জনপ্রিয় বা চেনা নামগুলিই স্থান পায়নি, বরং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের স্থানীয় কৃষিপণ্য এবং প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রন্ধনশৈলীও অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। লাদাখের বার্লি, সি-বাকথর্ন, এপ্রিকট ও ইয়াকের দুধের পনির থেকে শুরু করে কাশ্মীরের সুপরিচিত জাফরান, দুর্লভ ‘গুচ্ছি’ বা মোরেল মাশরুম এবং পদ্মের ডাঁটা—প্রতিটি উপকরণই তার সঙ্গে বহন করছিল এক অনন্য ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক আখ্যান। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই নৈশভোজটি স্বাদের পাশাপাশি হিমালয়ের মাটির নিজস্ব সত্তাকেও যেন জীবন্ত করে তুলেছিল।
ভোজনপর্বের সূচনা হয়েছিল জম্মুর অত্যন্ত জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড ‘কিম্ব চাট’ দিয়ে। সেদ্ধ কচুর ডাঁটা, মিষ্টি আলু ও চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি মুচমুচে টুকরোর সঙ্গে মিষ্টি দই, তেঁতুলের চাটনি এবং কামরাঙার অপূর্ব সংমিশ্রণ এই খাবারটিকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছিল। এরপর পরিবেশন করা হয় ‘নাদুর কাবাব’। পদ্মের ডাঁটা ও খাঁটি কাশ্মীরি মশলা দিয়ে তৈরি এই কাবাবের সঙ্গে ছিল সুস্বাদু আখরোটের চাটনি। লাদাখি স্যুপের মধ্যে মেনুতে ছিল ‘জা থুক’। বুনো নেটল পাতা, মটরশুঁটি এবং স্থানীয় মশলার সুষম মিশ্রণে তৈরি এই স্যুপটি লাদাখের ঐতিহ্যবাহী রন্ধনশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। ভাজা মিলেট বা বাজরা দিয়ে সাজানো এই স্যুপটি বিভিন্ন ধরণের ঐতিহ্যবাহী রুটির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। পাশাপাশি, ‘লাবো-না সোনমা’ স্যালাডটিতে লাদাখি মুলো এবং পনিরের সঙ্গে জম্মুর ‘কালারি’ পনির, শুকনো আপেল ও বুনো ক্যাপারসের মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছিল।
প্রধান পদগুলোর মধ্যে ‘হাক’ এবং ঐতিহ্যবাহী ‘আলুর দম’ জম্মু ও কাশ্মীরের খাঁটি ঘরোয়া স্বাদকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সর্ষের তেল ও হিং দিয়ে রান্না করা ‘হাক’ এবং দই, আদার গুঁড়ো ও মৌরিযুক্ত ‘আলুর দম’-এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয়েছিল সুগন্ধি ‘কানা গুচ্ছি পোলাও’। শেষপर्্যন্ত কাশ্মীরি ‘শুফতা’ এবং লাদাখের ‘ফায়মার’-এর মতো ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দিয়ে নৈশভোজের মধুর সমাপ্তি ঘটে। পানীয়ের তালিকায় ছিল কাশ্মীরি ‘কাহওয়া’, লাদাখের ‘গুর গুর চা’ এবং গোলাপের চা। সবমিলিয়ে, এই রাষ্ট্রীয় ভোজসভা প্রমাণ করে দিল যে খাবার কেবল খিদে নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং স্থানীয় উপকরণ ও ঐতিহ্যবাহী পদের মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে অত্যন্ত সাবলীল ও মার্জিতভাবে তুলে ধরার এটি এক সেরা মাধ্যম।