রাজ্যের ‘অসহযোগিতায়’ ₹২০,০০০ খোয়ালেন কৃষকরা! পিএম-কিষাণ বনাম ‘কৃষক বন্ধু’ বিতর্কে বিস্ফোরক বিজেপি

কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি (পিএম-কিষাণ) যোজনার অধীনে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৭০ লক্ষ কৃষক পরিবারের অ্যাকাউন্টে এ পর্যন্ত প্রায় দু’হাজার কোটি টাকা পৌঁছেছে। কিন্তু বিজেপির অভিযোগ অনুযায়ী, এই ‘সুখবর’-এর নেপথ্যে রয়েছে এক ‘বিষাদময় ইতিহাস’। তাদের দাবি, রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে এই কৃষকদের হাতে প্রথম দশ কিস্তির টাকা পৌঁছায়নি, যার পরিমাণ প্রতি কৃষকের জন্য প্রায় ২০,০০০ টাকা।
বিজেপির অভিযোগ, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত—অর্থাৎ দশটি কিস্তির পুরোটা—পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা পাননি। এই সময়কালে রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় যোজনায় নাম না দিয়ে নিজস্ব ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্প চালু করেছিল। ফলস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গই ছিল দেশের একমাত্র রাজ্য যেখানে এই দীর্ঘ সময় ধরে পিএম-কিষাণের সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ ছিল।
২০২২ সালের এপ্রিলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশেষে কেন্দ্রের স্বীকৃতি দিতে রাজি হওয়ার পর থেকে টাকা আসা শুরু হয় এবং আজ পর্যন্ত ১৮তম কিস্তি পর্যন্ত প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা রাজ্যের কৃষকদের কাছে পৌঁছেছে। তবে বিজেপির মূল অভিযোগ, হারানো দশ কিস্তির টাকা আর ফেরত আসেনি।
সমবায় ব্যবস্থার অবক্ষয় নিয়ে তোপ:
বঙ্গ বিজেপির দাবি, এই ঘটনা কেবল রাজনৈতিক টানাপোড়েনের নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে পরিচিত সমবায় ব্যবস্থার অবক্ষয়েরও করুণ সাক্ষী। তাদের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে একসময় কৃষকদের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত প্রাথমিক কৃষি ঋণ সমিতি (PACS)-এর সংখ্যা দ্রুত কমছে। ২০১০ সালে রাজ্যে ৮,০২৬টি পিএসিএস ছিল, যা ২০২৪ সালের হিসেবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪,৮৫০টিতে। অর্থাৎ, গত ১৪ বছরে প্রায় চার হাজার সমিতি হয় বন্ধ হয়ে গেছে, নয়তো নিষ্ক্রিয়। কারণ হিসেবে তারা নির্বাচন না হওয়া, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক উদাসীনতাকে দায়ী করেছে।
সমবায় আইন অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পিএসিএস-এর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, অভিযোগ উঠেছে বেশিরভাগ সমিতিতে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচন হয়নি। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকে সমবায় সমিতিগুলোতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ জারি করা হয়েছে। যেখানে তৃণমূলের লোক নেই, সেখানে নির্বাচন আটকে দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, মেয়াদ উত্তীর্ণ বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের জায়গায় দলের অনুগত নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হচ্ছে।
সমবায় দফতরের নিজস্ব রিপোর্টই বলছে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাজ্যের মাত্র ১৮৯টি পিএসিএস-এ নির্বাচন হয়েছে। এই অবক্ষয়ের ফলস্বরূপ, কৃষকদের এখন মহাজনের কাছে যেতে হচ্ছে এবং ৩০-৪০ শতাংশ উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে আগে সমিতি থেকে ৮-৯ শতাংশ সুদে ঋণ মিলত। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই অবস্থাকে ‘সাংবিধানিক যন্ত্রপাতির সম্পূর্ণ ভাঙন’ বলে অভিহিত করেছেন।