উত্তর ২৪ পরগনার রহড়া রিজেন্ট পার্ক এলাকার এক ঝাঁ-চকচকে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বিপুল পরিমাণ ‘অস্ত্রভাণ্ডার’-এর হদিশ মেলায় স্তম্ভিত ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের গোয়েন্দারা। ওই বহুতল আবাসন থেকে ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় এক হাজার রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এছাড়াও উদ্ধার হয়েছে নগদ লক্ষাধিক টাকা। এই ঘটনায় মধুসূদন ওরফে লিটন মুখোপাধ্যায় নামে ওই আবাসনের এক বাসিন্দাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আবাসনে আতঙ্ক:
শান্তশিষ্ট বলে পরিচিত লিটনের ফ্ল্যাট থেকে এমন ভয়ংকর অস্ত্রের মজুত দেখে গোটা রহড়া রিজেন্ট পার্ক এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীরা প্রশ্ন তুলছেন, এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কী কারণে মজুত করা হয়েছিল? এর পেছনে কি কোনো বড়সড় ষড়যন্ত্র রয়েছে? তদন্তকারীরা এখন সেই উত্তর খুঁজছেন।
সুপ্রতিম ভট্টাচার্য নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “শুনলাম এই আবাসন থেকে ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়েছে। এই নিয়ে আমরা খুবই আতঙ্কিত। এই আবাসনটি যেখানে অবস্থিত, সেখানে সবসময় নিস্তব্ধতা থাকে। ফলে আবাসনের ভিতরে কী হচ্ছে না হচ্ছে, সেটা বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল। পাড়ার মধ্যে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে সেটা আমরা ভাবতেই পারিনি। ভদ্রলোক খুব একটা মেলামেশা করতেন না কারও সঙ্গে। আশা করি, পুলিশ-প্রশাসন এই বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ করবে।”
জয়ন্ত চক্রবর্তী নামে আরও এক বাসিন্দা বলেন, “এই এলাকাটি যথেষ্ট শান্ত। আশপাশে অসংখ্য ফ্ল্যাট-বাড়ি রয়েছে। রাত-বিরেতে যদি কিছু ঘটে যায়, তা ভেবেই আমরা আতঙ্কিত। আমরা চাই দোষী ব্যক্তির যেন শাস্তি হয়।”
কীভাবে হদিশ মিলল অস্ত্রভাণ্ডারের?
পুলিশ সূত্রে খবর, কয়েকমাস আগে খড়দা থানা এলাকা থেকে বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র এবং কার্তুজ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। সেই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ মুঙ্গেরের এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর খোঁজ পায়। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই মধুসূদন ওরফে লিটন মুখোপাধ্যায়ের নাম উঠে আসে। এর পরেই সোমবার সকালে ব্যারাকপুর কমিশনারেটের গোয়েন্দা বিভাগ স্থানীয় থানাকে সঙ্গে নিয়ে রহড়ার ‘প্রতিভা মঞ্জিল’ নামে ওই আবাসনে হানা দেয়।
সেখান থেকেই বিপুল এই অস্ত্রভাণ্ডারের হদিশ মেলে। মধুসূদনকে জেরা করে পুলিশ জানতে পেরেছে, উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রগুলো তিনি পুরুলিয়া থেকে বানিয়ে এনেছিলেন। তাই প্রাথমিক তদন্তে ব্যারাকপুর কমিশনারেটের গোয়েন্দারা মনে করছেন, উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল এই কার্তুজ বিক্রি করার উদ্দেশ্যেই ধৃত ব্যক্তি তাঁর ফ্ল্যাটে মজুত করেছিলেন। তবে এর পিছনে অন্য কোনো রহস্য রয়েছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
কে এই মধুসূদন মুখোপাধ্যায়?
জানা গেছে, বহুতল ওই আবাসনের একতলায় থাকতেন মধুসূদন মুখোপাধ্যায়। ছাপোষা এই ব্যক্তি সচরাচর আবাসনের কারও সঙ্গে মিশতেন না। থাকতেন নিজের মতো করেই। তবে তাঁর চালচলনে কখনোই সন্দেহ হয়নি আবাসিকদের। তাঁরা বলছেন, “বছর তিনেক হয়েছে, তিনি এই আবাসনে এসেছেন।” কোথা থেকে তিনি এসেছেন? এর আগে কী করতেন? সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আবাসিক অথবা এলাকার বাসিন্দাদের কারোরই জানা নেই। পুলিশ এসে অভিযান চালাতেই গোটা ঘটনাটি তাঁদের কাছে স্পষ্ট হয়। এই ঘটনা জানাজানি হতেই এলাকায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন।
এদিকে, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই আবাসনে এখনও তল্লাশি চলছে ব্যারাকপুর কমিশনারেটের তরফে। ফলে এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত মুখ খোলেননি কমিশনারেটের কোনো পদস্থ পুলিশ কর্তাই। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনারেটের এক পুলিশ কর্তা বলেন, “উদ্ধার হওয়া অস্ত্রভাণ্ডারের মধ্যে দেশি-বিদেশি দু’ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রই রয়েছে। যেহেতু এখনও তল্লাশি অভিযান শেষ হয়নি, তাই আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজের সঠিক সংখ্যা বলা সম্ভব নয়। সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে।”





