একটিমাত্র গাছই নাকি ৬৫টি রোগের অব্যর্থ ওষুধ! সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন চাঞ্চল্যকর দাবি ঘিরেই এখন তোলপাড় উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা থানার ময়না গ্রাম। নেটপাড়ার এই ‘ম্যাজিক গাছ’-এর প্রচারের ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ঢল নামছে গ্রামে, যা নিয়ে রীতিমতো ফুঁসে উঠেছেন বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী মঞ্চের সদস্যরা। তাদের স্পষ্ট দাবি, ‘এটা ম্যাজিক নয়, পুরোটাই বুজরুকি!’ এই প্রতিবাদে শামিল হয়েছে বনগাঁ সায়েন্স ক্লাবও।
**স্বপ্নাদেশ থেকে ‘ম্যাজিক গাছ’-এর উৎস:**
স্থানীয় সূত্রে খবর, ময়না গ্রামের যুবক অপরূপ বৈদ্যই এই ‘ম্যাজিক গাছ’-এর খোঁজ পেয়েছিলেন, তাও আবার স্বপ্নাদেশে! গ্রামবাসীদের দাবি, অপরূপ স্বপ্নে নির্দেশ পেয়েছিলেন যে, ওই গাছের ঔষধি গুণ ব্যবহার করলেই নাকি সব রোগ উধাও হয়ে যাবে। অপরূপের সেই স্বপ্নের কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। এর পর থেকেই ময়না গ্রামের ভাগ্য এক লহমায় বদলে যেতে শুরু করে।
বর্তমানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ সেই তথাকথিত ‘ম্যাজিক গাছ’ থেকে ‘ওষুধ’ সংগ্রহ করতে ভিড় করছেন। মানুষের এই অস্বাভাবিক ভিড় ও কোলাহলে স্থানীয় একটি স্কুল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে স্থানীয়দের।
**অপরূপের ‘সেবা’ ও ‘তুকটাক’ আয়ের পথ:**
এদিকে, এই ‘ম্যাজিক গাছ’কে কেন্দ্র করে অপরূপ বৈদ্যরও ভাগ্যের চাকা ঘুরেছে। তিনি এখন দিনভর গাছের শিকড় দিয়ে লোকেদের ‘ওষুধ’ দিতে ব্যস্ত। বিনিময়ে, বহু মানুষ ‘ভালোবেসে’ তাঁকে অর্থও দিচ্ছেন। যদিও তিনি নিজেকে ‘দাবিদাওয়াহীন’ বলেই পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, অন্তত লোকমুখে তেমনটাই প্রচলিত।
‘ম্যাজিক গাছ’-কে ঘিরে এই গণজমায়েত দেখে এলাকায় অসংখ্য অস্থায়ী দোকানপাটও বসেছে। এর ফলে স্থানীয় কিছু মানুষের দু’পয়সা আয়ও হচ্ছে। শুক্রবার সেই গাছ থেকে ‘ওষুধ’ নিতে আসা এক মহিলা বলেন, “আমার শাশুড়ি বাতের ব্যথায় কাবু। শুনেছি এই গাছ নাকি সব ব্যথার অব্যর্থ ওষুধ। তাই এসেছি।” ভিড়ে আসা প্রতিটি মানুষেরই যেন আলাদা আলাদা কাহিনি, কিন্তু একটাই লক্ষ্য – অলৌকিকভাবে সমস্যার সমাধান। তাই তাদের ভরসা এখন ওই ‘ম্যাজিক গাছ’।
**বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী মঞ্চের তীব্র প্রতিবাদ:**
২০২৫ সালে যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করতে পারছে, রোবট রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশন করছে, সেই সময়ে মানুষের মধ্যে এই ধরনের অন্ধবিশ্বাস দেখে বহু যুক্তিবাদীর চোখ কপালে। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী মঞ্চের রাজ্য সম্পাদক প্রদীপ সরকার এই ঘটনাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “মানুষকে বোকা বানানো হচ্ছে। তা হলে তো ডাক্তারদের দরকারই ছিল না? এখানেই আসুক সমস্ত রোগী।”
তিনি আরও বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া দেখে অনেকে ছুটে আসছেন। এতে তাদের টাকাও নষ্ট হচ্ছে। কিছু লোক ঠকিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছেন।” এই সংগঠন পোস্টার ও প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশি, গাইঘাটা থানায় মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে। বনগাঁ সায়েন্স ক্লাবও এই ধরনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা প্রচারে নেমেছে।
এই ‘ম্যাজিক গাছ’ বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।