মেডিক্যালের লিমিটেড ইনফ্রাস্ট্রাকচারে মিরাকেল! দেড় মাসের কোমা কাটিয়ে কীভাবে বেঁচে ফিরলেন বাঁকুড়ার ডাক্তারি পড়ুয়া?

এ যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুকে পরাজিত করে নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার অলৌকিক গল্প! দীর্ঘ প্রায় দেড় মাসের কোমার গভীর ও বিষাদময় অন্ধকার কাটিয়ে অবশেষে চোখ মেললেন বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রথম বর্ষের ডাক্তারি পড়ুয়া আমান রাজ। প্রান্তিক জেলার হাসপাতালের সীমিত পরিকাঠামো ও ট্রমা কেয়ারের সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তরুণ এই ছাত্রকে সুস্থ করে তুললেন চিকিৎসকরা। বাঁকুড়া মেডিক্যালের নিউরো সার্জারি বিভাগের এই অভাবনীয় সাফল্যকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা মহলে এখন বয়ে যাচ্ছে আনন্দের জোয়ার।
ভয়াবহ দুর্ঘটনাই ডেকে আনে বিপর্যয়
বিহারের বাঁকা জেলার বাসিন্দা তরুণ আমান রাজের স্বপ্ন ছিল একজন দক্ষ চিকিৎসক হওয়ার। সেই অধ্যাবসায় নিয়েই বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। শুরুটাও হয়েছিল বেশ ভালোভাবেই। কিন্তু গত ১৭ সেপ্টেম্বর হস্টেলের কাছে এক মর্মান্তিক বাইক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে জখম হন আমান। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে তাঁকে তড়িঘড়ি ভর্তি করা হয় বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে। তারপর থেকেই শুরু হয় জীবন-মৃত্যুর কঠিন সংগ্রাম।
হাল ছাড়েননি চিকিৎসকরা
হাসপাতালে ভর্তির পর সিটি স্ক্যান থেকে শুরু করে একাধিক জটিল পরীক্ষা করা হলেও প্রথমদিকে মস্তিষ্কের জটিল ক্ষত চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে উঠেছিল। জ্ঞান হারিয়ে সম্পূর্ণ কোমাচ্ছন্ন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন আমান। সাধারণত এই ধরনের গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক ট্রমা কেয়ার ও উচ্চমানের পরিকাঠামোর প্রয়োজন হয়, যা জেলা স্তরের সরকারি হাসপাতালে পাওয়া বিরল। কিন্তু সমস্ত বাধা অতিক্রম করে নিউরো সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পুরো টিম লড়াই জারি রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রতি মুহূর্তের নিরলস নজরদারি, সঠিক সময়োপযোগী ওষুধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অবশেষে ঘটে সেই কাঙ্ক্ষিত অলৌকিক ঘটনা। দীর্ঘ দেড় মাস পর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকান আমান।
কী বলছেন চিকিৎসকরা?
নিউরো সার্জন চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘ ও কঠিন প্রচেষ্টার পর আমাদের নিজেদের কলেজের এক ছাত্রকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, এটা আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া। সে এখন অনেকটাই সুস্থ।”
অন্যতম চিকিৎসক তিয়াসা রায় জানান, “শুরুতে মস্তিষ্কে গভীর ক্ষতের ফলে মারাত্মক ইনফেকশনের ঝুঁকি ছিল। সরকারি হাসপাতালের গণ্ডিতে এমন জটিল রোগীকে বাঁচিয়ে তোলা ছিল মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ, যা আমরা চিকিৎসকরা জয় করতে পেরেছি।”
বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের সুপার অর্ণব গোস্বামী এই সাফল্যে গর্ব প্রকাশ করে জানিয়েছেন, আগামী দিনে নিউরো সার্জারি বিভাগের জন্য আলাদা উন্নত সেটআপ ও ওটি-র (OT) দিন সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বর্তমানে আমান অনেকটাই বিপদমুক্ত হলেও, তাঁকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে আরও কিছুদিন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও থেরাপির মধ্যে রাখা হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।