“লিটল বয় নাকি ফ্যাট ম্যান—কোনটি বেশি মারাত্মক ছিল?” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নথিতে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর সত্য!

১৯৪৫ সালের আগস্ট মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিমলগ্নে জাপানের দুটি সমৃদ্ধ শহর—হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর ভয়াবহ পারমাণবিক হামলা চালিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নিমেষের মধ্যে বিশ্ব মানচিত্র থেকে বদলে গিয়েছিল শহর দুটির চেহারা। শুধুমাত্র প্রচণ্ড বিস্ফোরণই নয়, তার সাথে তৈরি হওয়া প্রচণ্ড তাপ, বায়ুমণ্ডলের অতিপ্রবল বায়ুচাপ এবং মারাত্মক তেজস্ক্রিয়তা মিলে সৃষ্টি করেছিল এক নরকীয় বিপর্যয়। কিন্তু কতটা বিধ্বংসী ছিল সেই পরমাণু বোমা? কতদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল তার ধ্বংসাত্মক অভিঘাত? ইতিহাসের নথি ঘেঁটে সামনে এসেছে শিউরে ওঠার মতো কিছু তথ্য।

দুই শহরে দুই রূপ: ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট, সকাল ঠিক ৮টা ১৫ মিনিট। হিরোশিমার শান্ত আকাশে ছিটকে আসে আমেরিকার প্রথম পারমাণবিক বোমা ‘লিটল বয়’ (Little Boy)। প্রায় ১৫ হাজার টন টিএনটি (TNT) বিস্ফোরকের সমান ভয়ঙ্কর শক্তি ছিল এই বোমার।

এর ঠিক তিন দিন পর, ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরের বুকে আছড়ে ফেলা হয় দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ (Fat Man)। বৈজ্ঞানিক নথি অনুযায়ী, নাগাসাকির বোমাটি হিরোশিমার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল; যার ধ্বংসক্ষমতা ছিল প্রায় ২১ হাজার টন টিএনটি বিস্ফোরকের সমান।

চোখের পলকে আগুনের গোলা ও ৩ থেকে ৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ

হিরোশিমা শহরের মাটি থেকে প্রায় ৬০০ মিটার উঁচুতে শূন্যেই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল ‘লিটল বয়’-এর। বিস্ফোরণের প্রথম মুহূর্তেই বায়ুমণ্ডলে যে আগুনের গোলা (Fireball) তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রস্থলের তাপমাত্রা নিমেষের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল কয়েক লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াসে!

এমনকি মাটির কাছাকাছি এলাকার তাপমাত্রা মুহূর্তের মধ্যে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই ভয়াবহ উত্তাপে মানুষের শরীর, বিশাল বিশাল অট্টালিকা, গাছপালা—সব কিছু মুহূর্তেই বাষ্পীভূত হয়ে ছাইয়ে পরিণত হয়। শহর দুটি থেকে প্রায় ৩.৫ কিলোমিটার দূরে খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষের শরীরও সেই মারাত্মক তাপে চরমভাবে দগ্ধ হয়েছিল।

কতদূর পৌঁছেছিল বিভীষিকাময় শব্দ ও অভিঘাত?

যুদ্ধের পর প্রকাশ পাওয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা ও নথির তথ্য অনুযায়ী, নাগাসাকিতে বোমানিক্ষাপের ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা গিয়েছিল। তবে শব্দের চেয়েও বেশি বিধ্বংসী ছিল বায়ুমণ্ডলের শকওয়েভ বা তীব্র বায়ুচাপ। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বিস্ফোরণের প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই তীব্র অভিঘাতের হাওয়া বহু কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সমস্ত কিছু গুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল।

স্রেফ সেই দিনেই শেষ হয়নি মৃত্যুমিছিল

আমেরিকার এই পারমাণবিক হামলার ভয়াবহতা কেবল ৬ ও ৯ আগস্টের বিস্ফোরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ পাওয়া সরকারি হিসেব অনুযায়ী, হিরোশিমাতে আনুমানিক ১ লক্ষ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪ হাজার নিরীহ মানুষের করুণ মৃত্যু হয়।

যাঁরা সেই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের হাত থেকে কোনোক্রমে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের জীবনও থমকে যায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণের (Radiation) বিষাক্ত থাবায়। তেজস্ক্রিয়তার মারাত্মক প্রভাবে পরবর্তীকালে হাজার হাজার মানুষ লিউকোমিয়া, ক্যানসার সহ নানা জটিল ও দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, যার করুণ ছাপ বহাল ছিল কয়েক প্রজন্ম ধরে।