মেঘালয় হানিমুন মার্ডার কেসে পুলিশি হেফাজতে থাকা অভিযুক্তদের বয়ানে একের পর এক হাড়হিম করা তথ্য উঠে আসছে। ইন্দোরের ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী রাজা রঘুবংশী খুনে অভিযুক্ত সোনম ও তার প্রেমিক রাজের নৃশংস পরিকল্পনা শুনে চোখ কপালে উঠছে তদন্তকারীদের। পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে তারা মেঘালয়ের সোহরা বা নংরিহাট এলাকার পথচলতি যেকোনো এক তরুণীকেও খুন করার পরিকল্পনা করেছিল!
রাজার পর তরুণী খুন: এক অবিশ্বাস্য চক্রান্ত
ইস্ট খাসি হিলস জেলার পুলিশ সুপার বিবেক সিইয়েম জানিয়েছেন, মেঘালয়ের হানিমুন মার্ডার কেসে অভিযুক্তদের হেফাজতে নেওয়ার পর প্রথম দফার জেরায় এমন ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রাথমিকভাবে তাদের পরিকল্পনা ছিল, রাজাকে খুনের পর ছিনতাইকারীরা সোনমকেও হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে বলে রটানো হবে। কিন্তু কে, কীভাবে এই গুজব ছড়াবে, তা নিয়ে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল।
পরে তারা আরও নৃশংস একটি ছক কষে। রাজাকে খুনের পর পথচলতি কোনো তরুণীকে তারা মেরে ফেলবে। উদ্দেশ্য ছিল, ছিনতাইকারীরা রাজার পাশাপাশি সোনমকেও খুন করেছে—এই কথা প্রচার করে পুলিশকে বিভ্রান্ত করা। সোনমরা ঠিক করে, খুনের পর রাজার মৃতদেহ দুর্গম গিরিখাদে ফেলে দেওয়া হবে। তারপর সেখানকার অচেনা কোনো তরুণীকে খুন করে তার দেহ ও ভাড়া নেওয়া স্কুটি পেট্রল দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। এই নৃশংসতার উদ্দেশ্য ছিল, তরুণীর দেহ যাতে পুলিশ শনাক্ত করতে না পারে এবং সেই ফাঁকে সোনম গা ঢাকা দেওয়ার জন্য কিছুটা সময় পেয়ে যায়। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই শিউরে উঠছেন তদন্তকারীরা।
গুয়াহাটি থেকে শিলং: খুনের ছক কষার রুট ম্যাপ
তদন্তকারীদের দাবি, ধৃতেরা জেরায় জানিয়েছে যে, প্রথমে তারা কামাখ্যা মন্দিরে সোনমের পূজা শেষে গুয়াহাটিতেই রাজাকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু কোনো কারণে সেই পরিকল্পনা বানচাল হয়। তারপর শিলং ও সোহরা যাওয়ার প্ল্যান করে সোনম।
পুলিশ সুপার জানান, ২৩ মে নংরিহাটে সোনম ও তিন আততায়ী একত্রিত হয় এবং সেখানেই রাজাকে খুনের ছক কষে। এরপর তারা ওয়েইসডং জলপ্রপাতের দিকে এগোতে থাকে, যেখানে রাজার মর্মান্তিক পরিণতি হয়।
খুনের সময় ও প্রমাণ লোপাটের মরিয়া চেষ্টা
পুলিশ সুপার আরও জানান, সোনম ও তিন আততায়ীকে আলাদা আলাদাভাবে জেরা করার পর খুনের যে সময় তারা জানিয়েছে, তা থেকে অনুমান করা হচ্ছে, ২৩ মে দুপুর ২টা থেকে ২টা ১৮ মিনিটের মধ্য়ে রাজাকে খুন করা হয়। এরপরই রাজার মৃতদেহ গিরিখাদে ফেলে দেওয়া হয়।
প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, সোনম যে রেনকোট পরেছিল, সেটা সে আকাশকে দিয়ে দেয়। কারণ, আকাশের জামায় রাজার রক্তের অনেকটা দাগ লেগেছিল। খুন শেষে স্কুটিতে চেপেই ওয়েইসডং থেকে বেরিয়ে যায় চারজনই। আকাশ মাঝরাস্তায় তার গা থেকে সোনমের দেওয়া রেনকোট খুলে ফেলে দেয়। ভাড়া করা স্কুটিও ফেলে রেখে যায় রাস্তাতেই। এই প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল পরিকল্পিতভাবে অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা।
ইন্দোর পর্যন্ত সোনমের পলায়ন পথ ও পুলিশের তৎপরতা
তদন্তকারীদের জেরায় আততায়ীরা এবং সোনম জানিয়েছে, আগে থেকেই রাজ বিশালকে একটি বোরখা দিয়েছিল। ওই বোরখা পরেই সোনম প্রথমে পুলিশ বাজার এলাকায় যায়। সেখান থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে সোনম গুয়াহাটি যায় এবং বাসে চেপে পৌঁছয় শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি থেকে পাটনার বাস ধরে সোনম, এবং পাটনা থেকে আরা পৌঁছয় বাসেই। আরা থেকে সে লখনউয়ের ট্রেন ধরে এবং লখনউ থেকে বাসে সে ইন্দোর পৌঁছয়।
সোনম ইন্দোর ফিরে যাওয়ার আগেই মেঘালয় পুলিশের দু’টি তদন্তকারী টিম সাদা পোশাকে উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে পৌঁছে গিয়েছিল। প্রথমে পুলিশ আকাশকে গ্রেপ্তার করে। আকাশকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে জানতে পেরেই রাজ ঘাবড়ে গিয়েছিল। রাজ সোনমকে বলে, সে যেখানেই থাকুক না কেন, সে যেন তার বাড়িতে ফোন করে জানায় যে, অপহরণকারীদের হাত থেকে সে সবে ছাড়া পেয়েছে। প্রেমিক রাজের পরামর্শ মেনে সোনম গাজিপুরে গিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
শিলং আদালতের নির্দেশে, খুনে অভিযুক্ত সোনম-সহ পাঁচজন বুধবার থেকে আট দিনের পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। বৃহস্পতিবার পাঁচজনকে আলাদা আলাদাভাবে জেরা করা হয়েছে, এবং এই জেরা থেকেই বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত অপরাধের গভীরে থাকা আরও অনেক রহস্য উন্মোচন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।