মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও কাটার কথা ছিল ট্রেনের টিকিট! ত্বিষা শর্মা কাণ্ডে চাঞ্চল্যকর সিবিআই চার্জশিট!

মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তরুণী ত্বিষা শর্মা। রাজস্থানের নাসিরাবাদ যাওয়ার জন্য তিনি ট্রেনের টিকিট পর্যন্ত কেটে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেই রাতেই ভোপালের বাড়ির ছাদ থেকে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার হয়। সাম্প্রতিক অতীতে দায়ের করা সিবিআই-এর ৬০০ পাতার চার্জশিটে শেষ রাতের হাড়হিম করা ঘটনাপ্রবাহ থেকে শুরু করে গত কয়েক মাসের দাম্পত্য জীবনের তীব্র টানাপড়েনের এক ভয়াবহ ও বিস্তারিত ছবি তুলে ধরা হয়েছে।

সিবিআই-এর চার্জশিট অনুযায়ী, গত ১২ মে রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে ত্বিষা তাঁর ননদ রাশি আব্রলকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি চরম বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘Ask him to collect leftover of his wife. But tomorrow. Let me die in peace right now’’ অর্থাৎ, ‘‘ওকে বলো ওর বৌয়ের যা কিছু পড়ে থাকবে এসে নিয়ে যেতে। কিন্তু সেটা আজ নয়, আগামিকাল। আজ আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’’ এই মর্মান্তিক বার্তা পাঠানোর মাত্র চার মিনিট পর সিসিটিভি ক্যামেরায় তাঁকে সম্পূর্ণ একা বাড়ির ছাদে উঠতে দেখা যায়। এরপর রাত ৯টা ৪১ মিনিটে নিজের বাবাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে স্বামী সমর্থ সিংহের দুর্ব্যবহার ও নির্যাতন নিয়ে চরম আতঙ্ক প্রকাশ করেন। বাবা-মাকে দ্রুত ভোপালে তাঁর কাছে চলে আসার আকুল আবেদনও জানান তিনি। এরপর রাত ১০টা ৫ মিনিটে তিনি তাঁর মায়ের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন।

তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর দাবি, ওই দিন রাত ১০টা ২৩ মিনিট নাগাদ অভিযুক্ত স্বামী সমর্থ সিংহ এবং তাঁর মা গিরিবালা সিংহকে ছাদের দিকে দ্রুতগতিতে যেতে দেখা যায়। এরপর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ত্বিষাকে নীচের তলায় নামিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসকরা রাত ১০টা ৫৫ মিনিট নাগাদ তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। সিবিআই আরও জানিয়েছে যে, মাত্র পাঁচ মাসের সংক্ষিপ্ত দাম্পত্য জীবনে ত্বিষা ধারাবাহিকভাবে অকথ্য মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর অত্যন্ত ধুমধাম করে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর থেকেই ত্বিষার পুরনো সম্পর্ক নিয়ে কটূক্তি করা থেকে শুরু করে তাঁর ওপর তীব্র আর্থিক চাপ সৃষ্টি করার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ চার্জশিটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ত্বিষার নিজস্ব প্রায় ২০ লক্ষ টাকা শেয়ারে বিনিয়োগ করা ছিল। গত ৭ এপ্রিল খোলা একটি যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সেই সমস্ত টাকা জোর করে স্থানান্তরের জন্য তাঁকে লাগাতার মানসিক চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ, যা তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন।

পাশাপাশি, গত ১৬ এপ্রিল নিজের গর্ভাবস্থার কথা জানতে পারেন তরুণী। কিন্তু সন্তান আসার বিষয়টি অনভিপ্রেত হওয়া এবং স্বামীর অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে তীব্র উদ্বেগের জেরে তিনি গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেন। সেইমতো গত ৬ মে প্রথম এবং ৮ মে দ্বিতীয় দফার এমটিপি-র ওষুধ সেবন করেন তিনি। অত্যন্ত শারীরিক অসুস্থতা, রক্তপাত ও তীব্র মানসিক চাপের মধ্যেও স্বামী ও শাশুড়ির অমানবিক আচরণের শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। গত ৩০ এপ্রিল তিনি নিজের মাকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছিলেন, ‘‘মেরা জীবন নরক হো গয়া হ্যায় মাম্মি।’’ এমনকি ৭ মে তাঁকে দ্রুত বাড়ি থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য মাকে হাতজোড় করে অনুরোধও করেছিলেন। পরবর্তী কয়েক দিনে নিজের অসহায়তা, দমবন্ধ পরিবেশ এবং মৃত্যুর চিন্তার কথাও বিভিন্ন মেসেজের মাধ্যমে তিনি বন্ধুদের ও পরিবারের কাছে প্রকাশ করেছিলেন।

ঘটনার দিন অর্থাৎ ১২ মে সকালে নিজের বাবার কাছ থেকে ৩,০০০ টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরার পাকা টিকিটও কেটে ফেলেছিলেন ত্বিষা। দম্পতির মধ্যে দূরত্ব ঘোচাতে কাউন্সেলিংয়েরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চিকিৎসকের স্পষ্ট পরামর্শ ছিল, একে অপরের কথা ধৈর্যের সঙ্গে শোনা এবং সমস্ত ধরনের মাদক সেবন থেকে বিরত থাকা। কিন্তু বিকেলে বাড়ি ফিরে ত্বিষা পুনরায় অভিযোগ করেন যে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। দিল্লির এইমসের (AIIMS) মেডিক্যাল বোর্ডের দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছে, তাঁর মৃত্যু হয়েছে মূলত অ্যান্টিমর্টেম হ্যাংগিং বা গলায় ফাঁস লাগার কারণে। শরীরে এমন কোনো বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন মেলেনি যা মৃত্যুর আগে শারীরিক ধস্তাধস্তির ইঙ্গিত দেয়। ফলে এই চাঞ্চল্যকর মামলায় সিবিআই প্রধানত দীর্ঘস্থায়ী মানসিক নির্যাতনের অভিযোগকেই মূল ভিত্তি করেছে। অভিযুক্ত স্বামী সমর্থ এবং শাশুড়ি গিরিবালার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৮৫, ১০৮ এবং ৩(৫) ধারায় সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয়েছে।

তদন্ত এখানেই শেষ হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ত্বিষার ব্যবহৃত আইফোনের ফরেনসিক রিপোর্ট, ভোপালের বাড়ির ডিভিআর-এর সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষার রিপোর্ট এবং দুই অভিযুক্তের ভয়েস স্যাম্পলের রিপোর্ট আসা এখনও বাকি রয়েছে। এছাড়াও পণ সংক্রান্ত অভিযোগ এবং ডাওরি ডেথ বা পণের জন্য মৃত্যুর ধারায় আলাদাভাবে তদন্ত চালানোর জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চেয়েছে সিবিআই। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং আইনি লড়াই এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই সকলের নজর রয়েছে।