মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানেই নিজেদের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলেন পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি (Bilawal Bhutto Zardari)। শনিবার তিনি দাবি করেছিলেন যে, কুখ্যাত জঙ্গি মাসুদ আজহার পাকিস্তানে নয়, আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। কিন্তু রবিবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর মন্তব্যে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। এবার তিনি সরাসরি স্বীকার করে নিলেন যে, হাফিজ সইদ (Hafiz Saeed) এবং মাসুদ আজহারের (Masood Azhar) মতো জঙ্গিদের ভারতে প্রত্যর্পণ করতে পাকিস্তানের ‘কোনও সমস্যা নেই’। তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমেই ঘুরপথে কার্যত মেনে নেওয়া হলো যে, এই দুই ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি পাকিস্তানের মাটিতেই অবাধে বিচরণ করছে এবং সেখানেই তাদের আশ্রয়।
তবে বিলাওয়ালের এই ‘স্বীকারোক্তি’কে ভালোভাবে নেয়নি লস্কর-ই-তৈবার প্রধান হাফিজ সইদের ছেলে তহ সইদ (Toha Saeed)। তার মতে, পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রীর এই মন্তব্য দেশের সম্মান ক্ষুণ্ণ করেছে।
আল জাজিরার সাংবাদিক যখন লস্কর-ই-তৈবা প্রধান হাফিজ সইদ এবং জইশ-ই-মহম্মদ প্রধান মাসুদ আজহারের নাম ধরে তাদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তখনই বিলাওয়াল ভুট্টো স্পষ্ট জানান, “যে সমস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে সমস্যা রয়েছে তাদের ভারতে প্রত্যর্পণ করতে কোনও সমস্যা নেই পাকিস্তানের। ভারত যদি চায় তাহলে এমনটা হতেই পারে।”
স্মরণীয় যে, লস্কর-ই-তৈবা এবং জইশ-ই-মহম্মদ – উভয় জঙ্গি সংগঠনকেই পাকিস্তান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। হাফিজ সইদ ২৬/১১ মুম্বই সন্ত্রাসী হামলার মূলচক্রী। বর্তমানে সে সন্ত্রাসে অর্থ জোগানোর অভিযোগে ৩৩ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রসঙ্ঘ স্বীকৃত সন্ত্রাসবাদী মাসুদ আজহারকে পাকিস্তানের ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম অথরিটি (ন্যাকটা) কর্তৃক নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মাসুদ আজহার ভারতের অন্যতম ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্ত্রাসবাদী। ২০০১ সালের সংসদ হামলা, ২৬/১১ মুম্বই হামলা, ২০১৬ সালের পাঠানকোট এয়ারবেস হামলা এবং ২০১৯ সালের পুলওয়ামা আত্মঘাতী বোমা হামলা সহ ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক বড় সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে সে জড়িত ছিল। ১৯৯৯ সালে কান্দাহার হাইজ্যাক বা ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৮১৪ এর অপহরণ পরিস্থিতিতে বন্দি মুক্তির বিনিময়ে তাকে ভারতের হেফাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
যদিও এই দুই জঙ্গি নিষিদ্ধ, তবুও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তারা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং নিজেদের সংগঠন পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা পাক সেনার সমর্থন ব্যতীত সম্ভব নয়। এই প্রসঙ্গে বিলাওয়াল বলেন, “এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলি রয়েছে, তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। হাফিজ সইদ ও মাসুদ আজহারকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের জন্য বিচারের আওতায় আনা কঠিন, কারণ ভারতের তরফ থেকে তথাকথিত সহযোগিতার অভাব রয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ভারত এমন কিছু মৌলিক শর্ত মানতে নারাজ, যা এদের দোষী সাব্যস্ত করার জন্য আবশ্যক। এই মামলাগুলিতে আদালতে প্রমাণ পেশ করতে হয়, ভারতের লোকজনকে এসে সাক্ষ্য দিতে হয়, এবং পাল্টা অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয়। যদি ভারত এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে রাজি হয়, তাহলে কোনও ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করতে কোনও বাধা থাকবে না।”
বিলাওয়ালের এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সদিচ্ছা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, ভারতের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।