মাওবাদী শীর্ষ নেতৃত্বে ফাটল, আবুজমাড় জঙ্গলে নিহত ২ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা

ছত্তিশগড়-মহারাষ্ট্র সীমান্তবর্তী আবুজমাড় জঙ্গলে বন্দুকযুদ্ধে সিপিআই (মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটির দুই প্রবীণ নেতা নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন—তেলেঙ্গানার বাসিন্দা কট্টা রামচন্দ্র রেড্ডি ওরফে বিকল্প ওরফে রাজু দাদা (৬৩) এবং কাদারি সত্যনারায়ণ রেড্ডি ওরফে কোসা (৬৭)। তাঁরা উভয়েই তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দণ্ডকারণ্য স্পেশাল জোনাল কমিটির (ডিকেএসজেডসি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ছত্তিশগড় সরকার তাঁদের মাথার ওপর ৪০ লক্ষ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
অস্ত্র সমর্পণ নিয়ে বিভাজন ও মুখপাত্র বদল
এই দুই নেতার মৃত্যু ঘিরে বিতর্ক তীব্র হয়েছে মূলত শীর্ষ নেতৃত্বের মতপার্থক্যের কারণে:
মল্লোজুলা ভেনুগোপাল রাওয়ের বিবৃতি: সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপাত্র মল্লোজুলা ভেনুগোপাল রাও ওরফে অভয় একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিলেন যে মাওবাদীরা “শান্তি আলোচনার স্বার্থে সাময়িকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম স্থগিত” রাখতে রাজি।
বিদ্রোহী ঘোষণা: এর তাৎক্ষণিক বিরোধিতা করে ২০ সেপ্টেম্বর সত্যনারায়ণ রেড্ডি নিজেকে কেন্দ্রীয় কমিটির নতুন মুখপাত্র ‘অভয়’ হিসেবে এবং রামচন্দ্র রেড্ডি ডিকেএসজেডসি মুখপাত্র হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে সিপিআই (মাওবাদী) সশস্ত্র সংগ্রামের পথ থেকে সরে আসছে না, বরং রাও-এর মতামতকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে অভিহিত করেন।
অভ্যন্তরীণ অভিযোগ: তাঁরা অভিযোগ করেন, ভেনুগোপাল রাও দলের ঐক্য নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছেন। তাঁরা হুঁশিয়ারি দেন যে রাও চাইলে আত্মসমর্পণ করতে পারেন, কিন্তু দলীয় অস্ত্র পার্টির কাছেই সমর্পণ করতে হবে।
সংঘর্ষ না গোপন অভিযান?
২২ সেপ্টেম্বর সকালে বস্তার রেঞ্জের আইজি সুন্দর রাজ পি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের খবর প্রকাশ করে দাবি করেন যে “সকাল থেকে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ চলার পর দু’জন পুরুষ মাওবাদীর দেহ উদ্ধার হয়, সঙ্গে মেলে বিস্ফোরক ও অস্ত্র।”
তবে মানবাধিকার সংগঠন ও গণতান্ত্রিক মহল ঘটনাটিকে সাজানো ‘ফেক এনকাউন্টার’ হিসেবে অভিহিত করেছে:
নিরাপত্তা বেষ্টনী নিয়ে প্রশ্ন: তাঁদের মতে, কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের তিনস্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকে, অথচ সেই রক্ষী বাহিনীর কাউকে হারানো বা গ্রেপ্তারের খবর নেই।
নেতাদের উপস্থিতি: দুই শীর্ষ নেতার একই জায়গায় উপস্থিত থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মনে করা হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ সংকট ও চলাফেরার পরিবর্তনের কারণে তাঁদের অবস্থান ফাঁস হয়ে যায়।
বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি: তেলেঙ্গানা সিভিল লিবার্টিজ কমিটি ইতিমধ্যেই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
মাওবাদী আন্দোলনে গভীর সংকট
এই সংঘর্ষের জেরে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসংখ্যা নেমে দাঁড়াল মাত্র আটজনে। এর আগে গত মাসেই মোট চারজন কেন্দ্রীয় সদস্য নিহত হয়েছেন এবং একজন আত্মসমর্পণ করেছেন। অস্ত্র সমর্পণ নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বে বিভাজন, মুখপাত্র পদে পরিবর্তন এবং পরপর কয়েকজন কেন্দ্রীয় সদস্যের মৃত্যু— সব মিলিয়ে সিপিআই (মাওবাদী) বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে।
কট্টা রামচন্দ্র রেড্ডি ছিলেন এক সরকারি শিক্ষক এবং কাদারি সত্যনারায়ণ রেড্ডি ছিলেন কেসোরাম সিমেন্ট কারখানার শ্রমিক। তিন দশক আগে তাঁরা পিপলস ওয়ার গ্রুপে যোগ দেন। এই পরিস্থিতি কেবল মাওবাদী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নয়, সরকারের ‘অপারেশন খগর’-এর স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।