মহারাজা নলের হেঁশেল থেকে সোজা পাতে! প্রাচীন ভারতীয় রন্ধনশৈলী কি বদলে দিতে পারে আপনার জীবন?

গত অগস্ট মাসে রাখি পূর্ণিমা ও বিশ্ব সংস্কৃত দিবসের পবিত্র উপলক্ষকে সামনে রেখে ভারতীয় রন্ধনকলার সনাতন সংস্কৃতি ও পারস্পরিক ঐতিহ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা প্রসার ঘটাতে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছিল ‘পৌষ্টিক লাইফ’। প্রাচীন রাজা নলের ‘পাকদর্পণ’ গ্রন্থের বিভিন্ন বিশেষ পদ রেঁধে পরিবেশনের মাধ্যমে পুষ্টিকর ও আদর্শ লাইফস্টাইলের বার্তা তুলে ধরা হয় এই আয়োজনে। ১৯৬৯ সাল থেকে প্রতি বছর শ্রাবণ পূর্ণিমার দিনটি বিশ্ব সংস্কৃত দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে কৃষির দেবতা হলায়ুধ বা বলরামের জন্মতিথি তথা বলরাম জয়ন্তীও এই পূর্ণিমায় পালিত হওয়ায় অন্নের সঙ্গে এর নিবিড় সংযোগ রয়েছে। সংস্কৃত সাহিত্যে আহার ও রন্ধন-সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বাল্মীকি রামায়ণে খাদ্যের পাঁচরকম এবং মহাভারতে চার ধরনের শ্রেণিবিভাগের পাশাপাশি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুস্বাস্থ্য অর্জনের ক্ষেত্রে আদর্শ খাদ্যই প্রধান উপাদান।
আজকের আধুনিক সমাজে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে নানা ধরনের রোগের প্রকোপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃত্রিম প্রিজারভেটিভ, ক্ষতিকারক রাসায়নিক এবং কীটনাশকযুক্ত আল্ট্রা-প্রসেসড ফুডের যুগে প্রতিদিন আমরা নিজেদের থালায় অজান্তেই বিষ তুলে নিচ্ছি। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে হাজার বছর আগে সংস্কৃত শাস্ত্রে বর্ণিত ‘হিতাহার’ এবং মহারাজা নলের ‘পাকদর্পণ’ সংক্রান্ত চর্চা। এই ভাবনা থেকেই রুথ ও সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘পৌষ্টিক লাইফ’ ভারতীয় আহারের প্রাচীন ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছে। যজুর্বেদ ও কাশ্যপ সংহিতায় খাদ্য, কৃষি, সেচ ও প্রাকৃতিক উপাদানের বহুমুখী বিবরণ পাওয়া যায়।
এই বিশেষ আয়োজনে ‘পাকদর্পণ’ গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত কিছু সুস্বাদু পদের সমন্বয়ে এক অনন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল, যার সমগ্র পরিকল্পনা করেছিলেন খাদ্য সংস্কৃতি গবেষক দীপঙ্কর দাশগুপ্ত। আহারের তালিকায় রাখা হয়েছিল ফল-পুষ্প-পানীয়ম্, মধুক্ষীরঃ,ুদ্ধান্নম্, সিদ্ধ-কুর্পাটক ফলম্, পৌনর্নবীপত্র-ভর্জঃ, ঔদুম্বর-ব্যঞ্জনম্, কুমুদকন্দ-চিঙ্গট-ঘণ্টঃ, তহর্যন্নম্, মুদ্গ-বটকঃ, সহকারাবলেহঃ, বননিষ্পাব-লড্ডুকম্ এবং নবগোধূমচূর্ণ-পায়সম্। এই পদগুলিতে ব্যবহার করা হয়েছিল খাঁটি ঘি, সৈন্ধব লবণ, তাল গুড়, মধু ও ঢেকি ছাটা চাল।
ঐতিহাসিক এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মধ্যে বেহালা কলেজের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল ডঃ শর্মিলা মিত্র, সুদেষ্ণা মৈত্র নাগ, ডঃ অনিন্দিতা রায় চক্রবর্তী, ডঃ সুচরিতা সেনগুপ্ত, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, ডঃ পৃথ্বীশ মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, পার্থ মুখোপাধ্যায়, মৃন্ময়ী সিনহা, অনিন্দ্য হাজরা এবং ইতালির ভিসা দফতরের খাদ্য রসিক ড্যানিয়েল। প্রাচীন এই রন্ধনশৈলী চর্চার মাধ্যমে আধুনিক সমাজকে সুস্থ ও সচেতন রাখার এই প্রচেষ্টা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।