মমতা শিবিরের জন্য বড় ধাক্কা, শোভনদেবের মামলা খারিজ করে ঋতব্রতর অবস্থানে সিলমোহর আদালতের

কলকাতা হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশে স্বস্তি পেলেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ শিবিরের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের সিদ্ধান্তকে বহাল রেখে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও জানিয়ে দিয়েছেন, বিক্ষুব্ধ শিবিরের এই সিদ্ধান্তে আদালত আপাতত কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। ফলে রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে সমস্ত আইনি বাধা অপসারিত হলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের ‘অফিশিয়াল’ তথা কালীঘাট শিবিরের জন্য এটি এক বড়সড় ধাক্কা।

ঘটনার সূত্রপাত বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূলের অন্দরে যে অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল, তা প্রকাশ্যে রূপ নেয়। অভিযোগ ওঠে, সই জালিয়াতি করে দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে। এর জেরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ কালীঘাট গোষ্ঠী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু বহিষ্কৃত হলেও বিধানসভার সমীকরণে ঋতব্রতই নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। স্পিকার রথীন্দ্র বোস তাঁর আবেদন মান্যতা দিলে, বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তৃণমূলের বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার আদালত সেই আবেদন খারিজ করায় বিধানসভায় বিরোধী শিবিরের চালিকাশক্তি হিসেবে ঋতব্রতর অবস্থান আরও মজবুত হলো।

আদালতের এই রায়ে ঋতব্রতর পাশাপাশি অন্যান্য বিক্ষুব্ধ বিধায়করাও স্বস্তিতে। উপ-দলনেতা হিসেবে শিউলি সাহা এবং জাভেদ খান, এবং মুখ্য সচেতক হিসেবে আখরুজ্জামান তাঁদের দায়িত্ব পালন চালিয়ে যেতে পারবেন। রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় উচ্ছ্বসিত সন্দীপন সাহা জানিয়েছেন, “স্পিকারের পর হাইকোর্টও আমাদের স্বীকৃতি দিল। আমরা নিয়ম মেনেই সব করেছি।”

এদিকে, এই আইনি জটের মধ্যেই রাজ্যে শুরু হচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত বাজেট অধিবেশন। প্রথাগতভাবে রাজ্যপালের ভাষণের মাধ্যমে শুরু হতে চলা এই অধিবেশনে এবারের মূল আকর্ষণ হতে চলেছে বিধানসভার আসন বিন্যাস। রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত স্তরে তীব্র বৈরিতা থাকলেও, সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠিক পাশেই বসতে চলেছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বিধানসভা সচিবালয়ের খবর অনুযায়ী, দুই যুযুধান নেতার এই পাশাপাশি অবস্থান অধিবেশন চলাকালীন কক্ষে বাড়তি উত্তেজনা ছড়াবে। আগামী ২২ জুন নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত রাজ্যের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করবেন।

তবে এই লড়াই এখানেই শেষ নয়। আগামী জুলাই মাসে এই মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল পদ দখলের লড়াই নয়, এটি আসলে দলের অন্দরে ক্ষমতার মেরুকরণের গভীর লড়াই। ঋতব্রত যেভাবে পরিষদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিয়েছেন, তাতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব আজ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। শোভনদেবরা পরবর্তীতে উচ্চতর আদালতের দ্বারস্থ হন কি না, তা নিয়েও জল্পনা রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে হাইকোর্টের এই নির্দেশ ঋতব্রত শিবিরের জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক জয় এনে দিল। এখন দেখার বিষয়, বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত কতটা আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিতে পারেন এবং সরকারি পক্ষ কীভাবে তাঁর এই অবস্থানের মোকাবিলা করে। রাজ্য রাজনীতি এখন এক নতুন সমীকরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।