গত এক দশকে বাংলার রাজনীতিতে যদি কোনো নাম সবথেকে বেশি আলোচিত, সমালোচিত এবং চর্চিত হয়ে থাকে, তবে সেটি নিশ্চিতভাবেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কারও কাছে তিনি দলের পরম নির্ভরতা ‘সেনাপতি’, আবার বিরোধীদের কাছে তিনি তুরুপের তাস। কিন্তু স্রেফ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো হিসেবে নয়, নিজের দক্ষতায় কীভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের অঘোষিত ‘নাম্বার টু’ হয়ে উঠলেন তিনি? ফিরে দেখা যাক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই উল্কাসম উত্থানের কাহিনী।
শুরুটা যেভাবে: রাজনীতিতে হাতেখড়ি ১৯৮৭ সালে কলকাতায় জন্ম অভিষেকের। এমবিএ ডিগ্রিধারী এই যুবক যখন রাজনীতিতে পা রাখেন, তখন অনেকেরই ধারণা ছিল তিনি কেবল পারিবারিক পরিচয়েই টিকে থাকবেন। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর ‘তৃণমূল যুব কংগ্রেস’-এর সভাপতি হিসেবে তাঁর অভিষেক ঘটে। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে সুবক্তা হিসেবে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন তিনি। ২০১৪ সালে ডায়মন্ড হারবার থেকে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতেও তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে।
ভাইপো তকমা ও রাজনীতির লড়াই বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে বারবার তাঁকে ‘ভাইপো’ তকমা দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। কিন্তু অভিষেক সেই আক্রমণকেই হাতিয়ার করেছেন। প্রতিটি নির্বাচনী সভায় তাঁর পাল্টা হুঙ্কার— “তদন্ত করে প্রমাণ করুন।” এই লড়াকু মানসিকতাই দলের যুব কর্মীদের কাছে তাঁকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে। বিশেষ করে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের নেপথ্যে তাঁর সাংগঠনিক রণকৌশল এবং প্রশান্ত কিশোরের সংস্থাকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত ছিল মাস্টারস্ট্রোক।
তৃণমূলের আধুনিকীকরণ ও ‘সেনাপতি’ ইমেজ পুরনো ধ্যান-ধারণার রাজনীতি বদলে তৃণমূলকে একটি আধুনিক ও কর্পোরেট ঢংয়ের পেশাদার দল হিসেবে গড়ে তোলার কারিগর এই অভিষেকই। ‘তৃণমূলে নবজোয়ার’ যাত্রার মাধ্যমে টানা দুই মাস রাস্তায় কাটিয়ে সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছে গিয়েছেন তিনি। বর্তমানে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কেবল বাংলা নয়, ত্রিপুরা থেকে মেঘালয় পর্যন্ত ঘাসফুল শিবিরের জমি শক্ত করতে মরিয়া তিনি।
ভবিষ্যতের কাণ্ডারি? শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে দিলীপ ঘোষ— বিরোধীদের প্রধান নিশানা সবসময় অভিষেক। কিন্তু যতবারই ইডি-সিবিআই বা কেন্দ্রীয় এজেন্সির চাপ এসেছে, ততবারই তিনি বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার এই লড়াইয়ে তিনি আজ কেবল একজন সাংসদ নন, বরং বাংলার রাজনীতির এক অন্যতম ভরকেন্দ্র।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সফর কেবল একটি রাজনৈতিক উত্থান নয়, বরং আধুনিক বাংলার ক্ষমতার লড়াইয়ের এক জীবন্ত দলিল।





