ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ, পাসপোর্টও আটকে! ‘অর্ধ-নাগরিক’ হওয়ার আতঙ্কে প্রখ্যাত সাংবাদিক

একজন দেশের নাগরিকের কাছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া এবং ভোটাধিকার হারানো যে কতটা অপমানজনক, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন কলকাতার জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রাক্তন সম্পাদক রাজাগোপাল রামদাস। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কলকাতায় বসবাসকারী এই প্রবীণ সাংবাদিক বর্তমানে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। কেরালায় জন্ম নেওয়া এই সাংবাদিকের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ায় তাঁর নাম বাদ পড়ার কারণেই এখন তাঁর ভারতীয় পাসপোর্ট নবায়ন করতে বাধা দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক মাস আগে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম বাদ যাওয়ায় তিনি সেই সময় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা জীবনে নৈতিক কারণে তিনি নিজে ভোটদান থেকে বিরত থাকলেও, পরে তিনি ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি তাঁকে মানসিকভাবে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। তবে আসল ধাক্কা আসে জুন মাসে, যখন তিনি পাসপোর্ট নবায়নের জন্য আবেদন করেন।
মি. রামদাস বিবিসিকে জানিয়েছেন, পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের তরফে তাঁকে জানানো হয়েছে যে কলকাতা পুলিশ তাঁর ভোটাধিকার নিয়ে ‘সন্দেহ’ প্রকাশ করে একটি ‘অ্যাডভার্স’ রিপোর্ট জমা দিয়েছে। এই রিপোর্টের কারণেই তাঁকে নতুন পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, “পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ আমার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ করেনি, করেছে কলকাতা পুলিশ। তারা আমার পুলিশি ভেরিফিকেশনে ‘নো অবজেকশন’ দিতে নারাজ। পুলিশ আমাকে জানিয়েছে, যতক্ষণ ভোটার তালিকায় নাম না ফিরছে, ততক্ষণ ভেরিফিকেশন ক্লিয়ার করা সম্ভব নয়।”
পাসপোর্ট পোর্টাল বা নিয়মে কোথাও ভোটার আইডি কার্ডকে পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়নি, তা সত্ত্বেও কেন এই হয়রানি, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এই পরিস্থিতির ফলে তিনি তাঁর মেয়ের বিয়েতে যোগ দিতে পারেননি, যদিও তাঁর আগের পাসপোর্টে আমেরিকার দশ বছরের ভিসা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ‘এডিটার্স গিল্ড’ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যেও চিঠি চালাচালি হয়েছে।
আগামী ১৭ই জুলাই তাঁকে আবারও পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়েছে। মি. রামদাস বলছেন, তিনি তাঁর সমস্ত নথিপত্র এবং বায়োমেট্রিক তথ্য জমা দেওয়ার পরেও এই অনিশ্চয়তা কাটছে না। নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য নিরন্তর লড়াই করে চলেছেন এই প্রবীণ সাংবাদিক। বর্তমানে তাঁর পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে খারিজ না হলেও ‘ঝুলে’ রয়েছে, যার ফলে তিনি বিচারব্যবস্থায় যাওয়ার পথও পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছেন না। নিজের দেশেই নিজেকে ‘হাফ সিটিজেন’ বা অর্ধ-নাগরিক মনে হচ্ছে তাঁর, যা একাধারে বেদনাদায়ক ও আশঙ্কাজনক।