ভোটার তালিকায় নাম নেই তো নাগরিকত্ব গেল? সুপ্রিম কোর্টের তোপ, রাজ্য ও কমিশনকে কড়া নোটিস!

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনী বা ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়াকে ঘিরে চলা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে বড়সড় স্বস্তি মিলল নাগরিকদের জন্য। শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনের বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিল যে, এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া বা ট্রাইবুনালে মামলা বিচারাধীন থাকা মানেই তিনি নাগরিকত্ব হারিয়েছেন বা সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার অযোগ্য, এমনটা কখনোই নয়। শীর্ষ আদালতের এই পর্যবেক্ষণ প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন ফেলে দিয়েছে।

আদালত এদিন ফের স্পষ্ট করে দেয় যে, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা মানেই কেউ নাগরিকত্ব হারিয়েছেন—এই ধারণা ভ্রান্ত। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা হলেও, কারও নাগরিকত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার আইনি অধিকার তাদের নেই। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বিহারের এসআইআর মামলার রায়ের প্রসঙ্গ টেনে মনে করিয়ে দেন যে, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির জন্য কমিশন নাম যুক্ত বা বাদ দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, নাগরিকত্বের বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত। কমিশনের দায়িত্ব হলো সংশয় থাকলে বিষয়টি কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের কাছে পাঠানো, আর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট নাগরিকের মর্যাদা বহাল রাখতে হবে।

রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে আবেদনকারীর আইনজীবীরা জানান, এসআইআর-এ নাম বাদ পড়া বা ট্রাইবুনালে বিচারাধীন নাগরিকদের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার ও রেশন কার্ডের মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নোটিস পাঠিয়ে শীর্ষ আদালত প্রশ্ন তুলেছে—কেন এই নাগরিকদের সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে? পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিককেও জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

এসআইআর প্রক্রিয়া শেষে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটারদের বাদ দিলেও, প্রায় ৩০ লক্ষেরও বেশি ভোটার ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। এছাড়া কলকাতা হাইকোর্টের অধীনে গঠিত ১৯টি ট্রাইবুনালের কার্যপদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আবেদনকারীর তথ্য অনুযায়ী, ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ লক্ষেরও বেশি আবেদন বিচারাধীন থাকলেও মাত্র ৩৮ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট নামগুলি ভুলবশত বাদ পড়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের এসআইআর কমিটির চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ বসুর দায়ের করা এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ট্রাইবুনালগুলিতে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আশ্বাস দিয়েছেন যে, ট্রাইবুনালের জট কাটাতে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করবেন। পরবর্তী শুনানি ৩ সেপ্টেম্বর ধার্য করা হয়েছে। শীর্ষ আদালতের এই হস্তক্ষেপে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষের রেশন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার আশা উজ্জ্বল হলো।