আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার চালে এখন সবথেকে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের ‘ফ্রিজ’ বা অবরুদ্ধ হয়ে থাকা সম্পদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি ভারতের ব্যাঙ্কেও পড়ে আছে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ— যার অঙ্ক প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৫৬,০০০ কোটি টাকা। কেন এই বিপুল অর্থ ইরান ব্যবহার করতে পারছে না? কেনই বা ভারত এই টাকা মেটাতে পারছে না? বিষয়টি খতিয়ে দেখলে বেরিয়ে আসছে দশকের পর দশক ধরে চলা মার্কিন-ইরান সংঘাতের ইতিহাস।
ভারতের ওপর প্রভাব কেন? ভারত বরাবরই ইরানের অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। তেল কেনার বিনিময়ে ভারত যে অর্থ ইরানকে দেওয়ার কথা, তা ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলিতেই জমা রাখা হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে আমেরিকা বেরিয়ে যাওয়ার পর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং লেনদেন ব্যবস্থা (SWIFT) থেকে ইরান বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, ভারতের ব্যাঙ্কে টাকা জমা থাকলেও তা সরাসরি তেহরানে পাঠানোর কোনো আইনি পথ খোলা নেই।
বিশ্বজুড়ে ইরানের সম্পদের খতিয়ান: ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’-র রিপোর্ট অনুযায়ী, কেবল ভারত নয়, বিশ্বজুড়ে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও (৮ লক্ষ কোটি টাকার বেশি) বেশি সম্পদ আটকে আছে।
চিন: ২০ বিলিয়ন ডলার
ইরাক ও কাতার: প্রত্যেকের কাছে ৬ বিলিয়ন ডলার করে
জাপান: ১.৫ বিলিয়ন ডলার
আমেরিকা ও ইউরোপ: প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার
‘ফ্রোজেন অ্যাসেট’ বা অবরুদ্ধ সম্পদ আসলে কী? সহজ ভাষায়, যখন কোনো দেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গ করে বা অন্য কোনো দেশের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে, তখন তাদের বিদেশের ব্যাঙ্কে থাকা অর্থ বা বিনিয়োগ অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়। একেই বলে ‘ফ্রিজ’ করা। ইরান এই অর্থ পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া, কারণ তাদের অর্থনীতি বর্তমানে চরম সংকটের মুখে।
আমেরিকার ভয় কোথায়? শান্তি আলোচনার সময় ইরান বারবার অন্তত ৬০০ কোটি ডলার রিলিজ করার দাবি জানিয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের ভয়, এই অর্থ হাতে পেলে ইরান তা উন্নয়নমূলক কাজে না লাগিয়ে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি বা পারমাণবিক কর্মসূচিতে খরচ করবে। এই আস্থাহীনতার কারণেই বারবার আলোচনা ভেস্তে যাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও ইরানের মধ্যে এই ৫৬ হাজার কোটি টাকার লেনদেন শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি পুরোপুরি মার্কিন-ইরান সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। যদি আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে বা কোনো বড় কূটনৈতিক রফাসূত্র বেরোয়, তবেই কেবল ইরান তার এই ‘ফান্ড’ ফিরে পেতে পারে। ততক্ষণ পর্যন্ত ভারতের ব্যাঙ্কেই গচ্ছিত থাকবে ইরানের এই বিশাল সম্পদ।





