ভাঙ্গনের ছায়ায় ২১ জুলাই! ১৫ বছরের চেনা ছবি বদলে তপ্ত কলকাতার রাজপথ, কার কোন সভায় ভিড়?

গত প্রায় দেড় দশক ধরে একুশে জুলাইয়ের দিনটি মানেই ছিল সুদূর জেলাগুলি থেকে বাসভর্তি তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের ঢল, ধর্মতলার বিশালাকার জনসভা এবং নেত্রীর মুখ থেকে পরবর্তী রাজনৈতিক বার্তার জন্য অধীর অপেক্ষা। প্রথম সারির মন্ত্রী থেকে শুরু করে টলিউডের তারকারা—সকলের উপস্থিতিতে এই দিনটি রাজ্যের রাজনীতিতে এক প্রকার অঘোষিত ছুটির আমেজ তৈরি করত। কিন্তু চলতি বছরের একুশে জুলাইয়ের চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা, নজিরবিহীন এবং নাটকীয়তায় ভরপুর। দীর্ঘ ১৫ বছরের সেই চেনা এবং শৃঙ্খলিত ছবি আজ অতীত। শাসকদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং চরম ভাঙনের জেরে এবার একুশে জুলাই পালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে ও বিভক্ত পরিসরে।
এবারের প্রেক্ষাপটে একুশে জুলাইয়ের সভা আর কোনো একটি একক মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা একাধিক শিবিরে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গিয়েছে। একদিকে যেমন মেয়ো রোডের মঞ্চে ‘শহিদ দিবস’ পালন করছে ঋতব্রত শিবির, অন্যদিকে তেমনই এই বিশেষ মঞ্চে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বর্ষীয়ান মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, বিতর্কিত নেতা অনুব্রত মণ্ডল এবং হেভিওয়েট নেতা মদন মিত্রের মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিত্বদের। এর ঠিক বিপরীতে আবার কালীঘাট-তৃণমূলের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে সভা করার আয়োজন করা হয়েছে বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে। এই শেষোক্ত সভামঞ্চটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা ও চাঞ্চল্য। অভিযোগ উঠেছে যে, রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিতভাবে এই মঞ্চটি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এই খবর চাউর হতেই চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কালক্ষেপ না করে গভীর রাতেই সরাসরি ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং মঞ্চের সুরক্ষায় অনুগামীদের নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই রাতভর রাস্তায় বসে পাহারা দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি বছর একুশে জুলাইয়ের এই দিনটিকে কেন্দ্র করে শাসকশিবির যেভাবে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করত, এবারের চিত্রটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। দলের ভেতরকার তীব্র অসন্তোষ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হওয়ার ফলে আজ তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরাও চরম বিভ্রান্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কার ডাকে কোন মঞ্চে তাঁরা যোগ দেবেন, তা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরেই তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। একদিকে ঋতব্রত শিবিরের মেয়ো রোডের জমায়েত এবং অন্যদিকে খোদ নেত্রীর রাতভর পাহারা দেওয়া ও কালীঘাটের পৃথক কর্মসূচি—সব মিলিয়ে এবারের একুশ জুলাই বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন এবং অভাবনীয় অধ্যায়ের সূচনা করল, যা ভবিষ্যতে রাজ্যের শাসকদলের ক্ষমতার সমীকরণকে আমূল বদলে দিতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।