ভিড়ে ঠাসা আদালত চত্বর, মূল ফটক থেকে বিচারালয়ের দোরগোড়া পর্যন্ত অগুনতি মানুষের ভিড়। হঠাৎই এক পুলিশকর্মী হন্তদন্ত হয়ে ভিড় সরাতে শুরু করলেন, “সরে যান, সরে যান। স্যার আসছেন!” কিন্তু পরের দৃশ্যে চোখ রেখে সেই ভিড় হতবাক। এক রাশভারী ব্যক্তি বসে আছেন হাতে-টানা রিকশায়, আর সেই রিকশার সামনে এসকর্ট করে চলেছেন ওই পুলিশকর্মী।
কে এই ভিআইপি, যিনি রিকশায় চড়ে আদালতে ঢুকছেন? ভিআইপি হলে তাঁর বাতি লাগানো গাড়ি কোথায়? এই প্রশ্নগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছিল উপস্থিত জনতার মনে।
রুদ্ধশ্বাস তথ্যের উন্মোচন: বিচারকের আর্থিক দুরবস্থা?
খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রিকশায় আসা ওই ব্যক্তি আর কেউ নন, তিনি ওই আদালতেরই একজন বিচারক। আদালত থেকে সামান্য দূরেই তাঁর সরকারি আবাসস্থল বা কোয়ার্টার। সেদিন গাড়ি না পেয়ে তিনি রিকশাতেই চলে এসেছেন।
কিন্তু কেন গাড়ি পেলেন না? জানা গেছে, যে ব্যক্তি বিচারককে গাড়ি ভাড়া দেন, সরকারের ঘরে তাঁর লক্ষ লক্ষ টাকা বকেয়া পড়ে আছে। তিনি আর জ্বালানির টাকা নিজের পকেট থেকে খরচ করতে পারছেন না। অর্থাৎ, বিচারকদের যাতায়াত ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে সরকারের আর্থিক অনিয়ম!
শুধু রিকশা নয়, পায়ে হেঁটেও আদালতে বিচারকেরা!
সাম্প্রতিক অতীতে দক্ষিণবঙ্গের এক জেলা আদালতের এই ঘটনা সরকারিভাবে স্বীকার না করলেও, প্রত্যক্ষদর্শীরা এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। কিছুদিন আগে দুর্গাপুরেও একই কারণে বিচারকেরা দল বেঁধে পায়ে হেঁটে আদালতে গিয়েছিলেন বলেও খবর প্রকাশ্যে এসেছে। এই ঘটনাগুলি বিচারব্যবস্থার পরিকাঠামোগত দুর্বলতা এবং আর্থিক অব্যবস্থার এক ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরছে।
দীর্ঘদিন ধরে জেলায় বিচারকেরা মূলত ভাড়া গাড়ি ব্যবহার করে আসছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়, এবং সেই ব্যবসায়ীই গাড়ির চালক ও জ্বালানির খরচ বহন করে সরকারের কাছে বিল জমা দেন।
বকেয়ার পাহাড়: কোটি কোটি টাকার দেনা!
অভিযোগ উঠেছে যে, গত কয়েক বছর ধরে এই ভাড়া গাড়ির বিল বাবদ বকেয়ার পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে এবং তা এখন পাহাড়-সমান। সূত্র মারফত জানা গেছে, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা আদালতে শুধুমাত্র ভাড়া গাড়ির বিল বাবদ ২০২২ সাল থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা বকেয়া পড়ে আছে। হুগলি জেলাতে এই বকেয়ার পরিমাণ ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা। কোনো কোনো জেলায় বকেয়া ১০ লক্ষ টাকায় পৌঁছানোর পর সাময়িকভাবে এক-দুই লক্ষ টাকা দেওয়া হলেও, বাকিটা আবার বকেয়া পড়ে থাকছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের প্রায় ১৪০০ জেলা বিচারকদের মধ্যে ৯৫ শতাংশই এখন নিজেদের গাড়ি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। জানা গেছে, আগামী জুন মাসের পর সব বিচারককেই নাকি নিজেদের গাড়ি ব্যবহার করতে হবে। গাড়ির খরচ বাবদ বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত ১৩,৫০০ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচারকদের সরাসরি পেট্রল পাম্পে গিয়ে সই করে তেল তুলতে হয়, যেখানে পাম্প মালিকদের টাকা বছরের পর বছর বকেয়া পড়ে থাকছে। কলকাতায় পোস্টিং থাকলে মাসে ১০০ লিটার তেল এবং জেলায় ৭৫ লিটার তেল বরাদ্দ হলেও, পাম্প মালিকদের বকেয়ার ভার ক্রমশ বাড়ছে।
একজন জেলা বিচারবিভাগীয় প্রশাসক বলেন, “বিল এলে তা অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিল জমা হতে থাকে। কখনও রাজ্য থেকে কিছু টাকা স্যাংশন হলে তা দিয়ে কিছু বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া হয়। আবার যা কে তাই!”
বরাদ্দ বাড়লেও কেন এই দুরবস্থা? আইনজীবীদের বিলের সঙ্গে তুলনা
প্রশ্ন উঠছে, কেন এই টাকা পাওয়া যাচ্ছে না? হিসাব বলছে, গত ১০ বছরে বিচার ব্যবস্থার জন্য রাজ্য বাজেটে বরাদ্দ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০১৪-১৫ আর্থিক বছরে যেখানে বরাদ্দ ছিল ২৪ কোটি টাকা, সেখানে ২০২২-২৩-এ বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ কোটি টাকা।
অথচ, তথ্য জানার অধিকার আইনে (RTI) জানা গেছে, ২০২২-২৩ আর্থিক বছরে হাইকোর্টে রাজ্যের প্যানেলের আইনজীবীদের ফি বাবদ প্রায় ৪২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এবং চলতি বছরে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের প্যানেলের আইনজীবীদের প্রায় ৬০ কোটি টাকা মেটানোর একটি তালিকা কয়েকদিন আগেই প্রকাশ্যে আসার পর তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়েছে। শুধু হাইকোর্ট নয়, নিম্ন আদালতেও রাজ্যের প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের ফি বাবদ ২০২৩ সালে প্রায় ৩১ কোটি টাকা মেটানো হয়েছে বলে খবর।
বিচারবিভাগীয় প্রশাসকদের অভিযোগ, রাজ্যে সরকারের হয়ে মামলা লড়ার জন্য বছরে যে টাকা খরচ হচ্ছে, গোটা রাজ্যের বিচার ব্যবস্থা চালানোর জন্য বরাদ্দ তার থেকে কম! তার উপর কাগজে-কলমে যতটা বরাদ্দ হচ্ছে, বাস্তবে তার সিংহভাগই নিম্ন আদালত পাচ্ছে না, যার ফলে তাদের দুরবস্থা চরমে। তাঁরা আরও অভিযোগ করেছেন যে, জেলার ডিএম-এসপি-দের মতো তাঁদের হাতে আর্থিক ক্ষমতা নেই, যে কারণে তাঁদের গাড়ির বিল বা অন্য কোনো খরচ বকেয়া থাকে না। অর্থের অভাব কেবল আদালতে!
বিচারকদের হাতে টানা রিকশায় আদালতে আসা, পায়ে হেঁটে বিচারকদের কর্মস্থলে পৌঁছানো—এই ছবিগুলি কি রাজ্য বিচার ব্যবস্থার প্রতি সরকারের উদাসীনতার এক চরম দৃষ্টান্ত? এই পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন না হলে বিচারপ্রার্থীরাই চূড়ান্ত ভোগান্তির শিকার হবেন।
তথ্যসূত্র:এই সময়