উত্তর ২৪ পরগনার মতো তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম শক্ত দুর্গে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দলের অন্দরে বড়সড় ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছে। জেলার ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র ৯টিতে জয়লাভ করেছে ঘাসফুল শিবির। বারাসত ও তার সংলগ্ন এলাকায় বিজেপির অভাবনীয় উত্থান এবং তৃণমূলের শোচনীয় পরাজয়ের দায় শেষ পর্যন্ত এসে পড়ল স্থানীয় সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের ওপর। রাজনৈতিক মহলের জল্পনা সত্যি করে, এবার কার্যত কাকলির ‘ডানা ছাঁটা’ হল। বৃহস্পতিবার কালীঘাটে তৃণমূলের সংসদীয় দলের বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের পুরনো সেনাপতি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরেই আস্থা রাখলেন। কাকলিকে সরিয়ে কল্যাণকেই পুনরায় লোকসভায় দলের ‘চিফ হুইপ’ বা মুখ্য সচেতক ঘোষণা করা হল।
সংসদীয় দলের এই রদবদল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে তৃণমূলের সংসদীয় দলে বড় পরিবর্তন এনেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় দলনেতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সেই সময় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্য সচেতকের পদ থেকে ইস্তফা দিলে সেই স্থানে আনা হয়েছিল কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে। তৎকালীন সময়ে মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে কল্যাণের প্রকাশ্য বাদানুবাদ এবং দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়ে কম চর্চা হয়নি। কিন্তু ন’মাস কাটতে না কাটতেই ফের পাশা উল্টে গেল। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয় এবং আইনি লড়াইয়ে কল্যাণের লড়াকু মেজাজ দেখে তাঁকেই যোগ্য মনে করেছেন নেত্রী।
বৃহস্পতিবার কালীঘাটে নিজের বাসভবনে সাংসদদের নিয়ে বিশেষ বৈঠকে বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, আগামী দিনে লোকসভায় দলের রাশ থাকবে কল্যাণের হাতেই। সূত্রের খবর, ভোট পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত মামলাগুলিতে যেভাবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আইনি লড়াই লড়ছেন, তাতে নেত্রী অত্যন্ত সন্তুষ্ট। বৈঠকে মমতা বলেন, “আমরা একটি অত্যন্ত কঠিন নির্বাচনে লড়াই করেছি। আমরা শুধু বিজেপির বিরুদ্ধেই লড়িনি, বরং বিজেপির পুরো রাষ্ট্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। বিশেষ করে আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে কল্যাণ খুব ভালো কাজ করেছে।” নেত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, আদালতে যেখানে বিজেপি ১০০ জন আইনজীবীকে নামিয়েছিল এবং ঘরের ভেতরে স্লোগান দিচ্ছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন কল্যাণ।
এই রদবদলের নেপথ্যে উত্তর ২৪ পরগনার ফল একটি বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। বারাসত লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিধানসভাগুলিতে শাসক দলের ধরাশায়ী অবস্থা কাকলির সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। লোকসভা ও রাজ্যসভায় আগামী দিনে তৃণমূলের ভূমিকা কী হবে এবং কেন লোকসভা ভিত্তিক ফলাফল খারাপ হল, তা নিয়েও এদিনের বৈঠকে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংসদদের নির্দেশ দিয়েছেন এখন থেকে আরও বেশি সক্রিয় হতে এবং সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনতে। শেষ পর্যন্ত কল্যাণের পুরনো পদে ফেরা এটাই প্রমাণ করল যে, কঠিন সময়ে লড়াকু এবং অভিজ্ঞ নেতাদের ওপরেই ভরসা রাখতে চাইছেন তৃণমূল সুপ্রিমো।





