‘ব্ল্যাক ডে’-তেই রক্তের নদী মণিপুরে! গর্ভবতী মহিলাসহ ৪ জনকে নির্বিচারে গুলি, নেপথ্যে কারা?

দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত হিংসায় উত্তপ্ত মণিপুর ফের রক্তভেজা বাস্তবতার মুখোমুখি। রাজ্যের তামেংলং জেলায় কুকি-জো সম্প্রদায় অধ্যুষিত দুই গ্রামে পৃথক সশস্ত্র হামলায় গর্ভবতী মহিলাসহ অন্তত চারজন গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছে ছয় বছরের একটি শিশুও।

রবিবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তোলেন এবং লংপি গ্রামে এই জোড়া হামলার ঘটনা ঘটে। দু’টি ক্ষেত্রেই হামলাকারীরা ছিল অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তামেংলং ও আশেপাশের এলাকায় নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

ভোররাতে ঘরে ঢুকে তাণ্ডব: প্রাণ হারালেন গর্ভবতী মহিলা ও তাঁর স্বামী

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খবর, প্রথম হামলাটি ঘটে রবিবার ভোররাতে তোলেন গ্রামে। অভিযোগ, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতী একটি বাড়িতে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন লিংজাংগাই সিংসিত, তাঁর স্বামী সেনেহ সিংসিত এবং তাঁদের ছ’বছরের সন্তান।

আশঙ্কাজনক অবস্থায় অসম রাইফেলসের জওয়ানরা তাঁদের উদ্ধার করে জিরিবাম হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মৃত্যু হয় অন্তঃসত্ত্বা লিংজাংগাই ও তাঁর স্বামীর। শিশুটি বর্তমানে গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

কয়েক ঘণ্টা পর ফের রক্তপাত: কেনাকাটা করে ফেরার পথে গুলি

তোলেনের মর্মান্তিক ঘটনার কয়েক ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই দুপুর ৩টে নাগাদ দ্বিতীয় হামলাটি হয় লংপি গ্রামে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে বাড়ি ফেরার পথে তিন গ্রামবাসীকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান জুলি সিংসন এবং থাংভেল গ্যাংটে নামের দুই ব্যক্তি।

ঘটনার পর থেকে আরও এক মহিলা নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আক্রমণের পর হামলাকারীরা গ্রামে ঢোকার চেষ্টা করলেও বাসিন্দারা একজোট হয়ে প্রতিহত করায় দুষ্কৃতীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

১৩ সেপ্টেম্বরের ‘ব্ল্যাক ডে’ এবং নাগা-কুকি টানাপোড়েন

ঘটনার সময়কাল নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের ভয়াবহ কুকি-নাগা সংঘর্ষে নিহতদের স্মরণে প্রতি বছর ১৩ সেপ্টেম্বর ‘ব্ল্যাক ডে’ বা কালো দিবস হিসেবে পালন করে কুকি সম্প্রদায়। ঠিক সেই দিনেই কুকি বসতিতে এই ধরণের রক্তক্ষয়ী হামলা নতুন করে পুরানো ক্ষত উসকে দিয়েছে।

কুকি সংগঠনগুলির অভিযোগ, এই হামলার পেছনে নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠী NSCN(IM) এবং ZUF-এর হাত রয়েছে। তবে পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে এখনও এর কোনো অফিসিয়াল সত্যতা মেলেনি। অন্যদিকে, কাইমাই নাগা ভিলেজ অথরিটি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জানিয়েছে, কোনো অজ্ঞাতপরিচয় গোষ্ঠী এই ঘটনা ঘটিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে বিভাজন তৈরির চক্রান্ত করছে।

জাতীয় সড়কে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষ করে ইম্ফল-জিরিবাম সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ NH-37 জাতীয় সড়কের কাছে এই ধরনের ঘটনা ঘটায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকা জুড়ে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

২০২৩ সাল থেকে চলা মেইতেই-কুকি সংঘর্ষের ক্ষত এখনও শুকোয়নি মণিপুরে। তার ওপর কুকি-নাগা অধ্যুষিত এলাকায় নতুন করে এই রক্তপাত রাজ্য প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার, প্রশাসন কত দ্রুত মূল অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে পারে এবং সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হিংসা আটকায়।