ব্রহ্মপুত্রের গতিপথে চিনের থাবা! সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিমি দূরে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প?

তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর ভাটির দিকে, ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে চিন এক বিশাল জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে, যা ভারতের জন্য নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে ভারতীয় সংস্থাগুলো এই প্রকল্পের ভয়াবহতা সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক করেছে। দীর্ঘদিনের উদ্বেগ সত্ত্বেও বেইজিং এই নির্মাণকাজকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

তিব্বতে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো নদী ভারতে অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে ‘সিয়াং’ নামে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে আসামে ‘ব্রহ্মপুত্র’ হিসেবে প্রবাহিত হয়। ভারতের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা এই ব্রহ্মপুত্রের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর উজানে এই বিশাল বাঁধ নির্মাণের ফলে জলের স্বাভাবিক প্রবাহ ও পলি পরিবহনের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে ভাটির দিকের অঞ্চলে বন্যার ধরনে আমূল পরিবর্তন ঘটা এবং মারাত্মক পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই প্রকল্পের শুধুমাত্র পরিবেশগত প্রভাবই নয়, বরং এর কৌশলগত দিকটিও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর উজানে বিশাল বাঁধ থাকলে যেকোনো সংঘাতের পরিস্থিতিতে বেইজিং জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভারতকে চাপে ফেলার বাড়তি সুবিধা পেয়ে যাবে। যদিও চিনের পক্ষ থেকে বারংবার দাবি করা হয়েছে যে, এই প্রকল্পগুলোর মূল লক্ষ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং এর ফলে ভাটির দিকের দেশগুলোর কোনো ক্ষতি হবে না, তবুও নয়াদিল্লি এই ঝুঁকি নিতে কোনোভাবেই রাজি নয়।

ভারত সরকার এই পুরো পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং গত বছর সংসদে জানিয়েছিলেন যে, ১৯৮৬ সাল থেকে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়ে চিন কাজ করছে এবং সরকার প্রতিটি মুহূর্তের খবর রাখছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সরকার ক্রমাগত চিনকে সতর্ক করে আসছে যাতে তাদের উজানের কোনো কর্মকাণ্ডের ফলে ভাটির দেশগুলোর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়।” আন্তঃসীমান্ত নদী সংক্রান্ত যেকোনো বিতর্কিত বিষয় আলোচনার জন্য ২০০৬ সালে একটি ‘বিশেষজ্ঞ-পর্যায়ের ব্যবস্থা’ (Expert Level Mechanism) গঠন করা হয়েছিল। সেই চ্যানেলের মাধ্যমেই ভারত বারবার তাদের উদ্বেগের কথা বেইজিংয়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

ভাটির দিকের এলাকায় বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত রাখতে ভারত সরকার ইতিমধ্যে একাধিক প্রতিরোধমূলক ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ভারত কোনো আপস করতে নারাজ। ব্রহ্মপুত্রের মতো একটি আন্তর্জাতিক নদীর ওপর চিনের এই একতরফা আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার জল-রাজনীতিতে এক নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারত এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে এবং ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা এড়াতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে।