মেঘালয়ের রাজা রঘুবংশী খুনের তদন্তে এবার উঠে এল পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরের নাম। স্বামীকে নৃশংসভাবে খুন করার পর অভিযুক্ত সোনম রঘুবংশী শিলিগুড়িতে গা ঢাকা দিতে চেয়েছিলেন, এমনকি সেখানে পুলিশের কাছে কীভাবে ‘নাটকীয় আত্মসমর্পণ’ করবেন, সেই চিত্রনাট্যও নাকি তৈরি রেখেছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পুলিশের একটি চালে তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। শিলিগুড়ির বদলে তিনি ধরা পড়েন বেনারস-গাজিপুর রোডের পাশে একটি ধাবায়।
পালানোর ছক: শিলিগুড়ি কেন পছন্দের ঠিকানা?
শুক্রবার ইস্ট খাসি হিলসের পুলিশ সুপার বিবেক সিয়েম ‘এই সময়’কে জানান, “৮ জুন ইন্দোর থেকে সোনমের শিলিগুড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক অভিযুক্ত ধরা পড়ে যাওয়ায় রাজার (প্রেমিক) একটি ফোন তার যাত্রাপথ পরিবর্তন করে দেয়।”
কিন্তু দেশের এত শহর থাকতে শিলিগুড়িকেই কেন বেছে নিয়েছিলেন সোনম? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। তাদের বক্তব্য, ২৩ মে শিলংয়ের সোহরা এলাকায় রাজাকে খুনের পর সোনম নিজের রেনকোটটি আকাশ নামে এক অভিযুক্তকে দিয়ে একটি বোরখা পরে নেন। পালানোর সময় যাতে কেউ তাকে চিনতে না পারে, সেজন্য খুনের অন্যতম চক্রী ও সোনমের প্রেমিক রাজা কুশওয়াহা আগেই বিশাল চৌহান নামে অন্য এক অভিযুক্তের মাধ্যমে বোরখাটি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
এক অস্থির যাত্রা: ইন্দোর থেকে পাটনা হয়ে ধাবা
পোশাক পরিবর্তনের পর সোনম আকাশের স্কুটিতে চেপে পাহাড়ি এলাকা থেকে শহরে আসেন। এরপর পুলিশ বাজার এলাকায় পৌঁছে সেখান থেকে ট্যাক্সিতে গুয়াহাটি বাসস্ট্যান্ডে চলে যান। পরদিন সকালে তিনি শিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাসে নামেন। সকালে সেখানকার একটি দোকানে ব্রেকফাস্ট করে পাশের কাউন্টার থেকে পাটনা যাওয়ার বাসের টিকিট কাটেন। এরপর পাটনা পৌঁছে সেখান থেকে আরা স্টেশনে যান এবং লখনউগামী ট্রেনে ওঠেন। ট্রেন থেকে নেমে ফের চাপেন ইন্দোরগামী বাসে।
মধ্যপ্রদেশ পুলিশের দাবি, ২৫ মে ইন্দোরের দিওয়াস গেটের কাছে একটি ভাড়া করা ফ্ল্যাটে ওঠেন সোনম। ৭ জুন পর্যন্ত সবকিছু পরিকল্পনামাফিক চলছিল। সোনম বাইরে না বেরোলেও প্রেমিক রাজের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ রাখছিলেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল, ৮ তারিখ সোনম শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা দেবেন।
নাটকীয় আত্মসমর্পণের ব্যর্থ চেষ্টা: ধাবায় ধরা পড়লেন সোনম
শিলিগুড়িতে পৌঁছে সোনম কোনো একটি ফাঁকা চায়ের দোকানে বিধ্বস্ত অবস্থায় গিয়ে একটি পূর্ব-নির্ধারিত গল্প ফেঁদে বসবেন: “আমার নাম সোনম রঘুবংশী। বাড়ি মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে। মেঘালয় থেকে অপহরণের পর মাদক জাতীয় কিছু খাইয়ে আমাকে এখানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিয়ের পর স্বামী রাজা রঘুবংশীর সঙ্গে শিলংয়ে হানিমুনে গিয়েছিলাম। কয়েকজন দুষ্কৃতী আমার স্বামীকে খুন করে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।” এই বয়ানে পুলিশকে বিভ্রান্ত করে পরবর্তী পরিকল্পনা ছকে নেওয়ার সময় পাওয়া যাবে বলে তারা ভেবেছিল।
কিন্তু ৮ তারিখ সকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। রাজাকে কাটারি দিয়ে আঘাত করা আকাশ রাজপুতকে উত্তরপ্রদেশের ললিতপুর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এতেই ঘাবড়ে গিয়ে কৌশল পাল্টে ফেলেন সোনম এবং রাজ। সিদ্ধান্ত হয়, শিলিগুড়ি না গিয়ে সোনম উত্তরপ্রদেশ চলে যাবেন, কারণ ওই রাজ্যে রাজের একাধিক পরিচিত থাকেন যারা প্রয়োজনে তাকে সাহায্য করতে পারবেন। এরপর রাজের ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে সোনম রওনা দেন পাটনার দিকে, সেখান থেকে যান গাজিপুরে। ততক্ষণে একাধিক অভিযুক্তকে তুলে নিয়েছে পুলিশ। ফলে তড়িঘড়ি রাস্তার পাশে একটি ধাবায় গিয়ে তিনি সেই অপহরণের গল্প ফেঁদে বসেন। যদিও তা আর ধোপে টেকেনি। পুলিশ স্বামী রাজা রঘুবংশীকে খুনের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে।
রঘুবংশী হত্যা মামলায় এই নতুন মোড় একদিকে যেমন তদন্তের জটিলতা বাড়িয়েছে, তেমনই এক অভিযুক্তের পালানোর চেষ্টায় অভিনব চিত্রনাট্য তৈরির চেষ্টা জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।