বুকের ব্যথা ছাড়াই ধেয়ে আসছে ঘাতক! সাইনাসের চেয়েও নীরব হার্ট অ্যাটাকের এই ৩টি লক্ষণ চেনেন কি?

আমরা সবাই জানি হার্ট অ্যাটাক হলে বুকে তীব্র ব্যথা, হাত ঝিনঝিন আর দম বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু বিপদটা আরও বেশি সেখানে, যেখানে কোনো সাড়া শব্দই থাকে না। একেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক (Silent Heart Attack)। নামের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে এর মূল রহস্য—এটি একদম নিঃশব্দে শরীরে বাসা বাঁধে। আর সেই কারণেই সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন না এবং দ্রুত চিকিৎসা করাতে গিয়ে বড় ধরনের দেরি হয়ে যায়। বিশিষ্ট চিকিৎসকদের মতে, প্রতি ৫ জন হার্ট অ্যাটাকের রোগীর মধ্যে অন্তত ১ জনেরই এই সাইলেন্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে।
তাহলে সাধারণ মানুষ বুঝবেন কী করে যে তাঁদের শরীরে বড় কোনো বিপদ ঘনিয়ে আসছে? চিকিৎসকদের মতে, আমাদের শরীর কিন্তু এই মারাত্মক আক্রমণ আসার আগেই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ৩টি ছোট সঙ্কেত দেয়। আমরা সাধারণত সেগুলোকে সাধারণ গ্যাস, অম্বল, বদহজম বা দৈনন্দিন ক্লান্তি ভেবে অবহেলায় উড়িয়ে দিই। আর ঠিক সেখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়ে যায়।
প্রথম সঙ্কেত হলো অস্বাভাবিক ক্লান্তি। দৈনন্দিন জীবনে কোনো ভারী কাজ বা পরিশ্রম না করা সত্ত্বেও সারাদিন শরীর ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত লাগছে। সামান্য সিঁড়ি ভাঙতে গিয়েই হাঁপিয়ে যেতে হচ্ছে। আগে যে কাজ করতে ১০ মিনিট সময় লাগত, এখন তা সম্পন্ন করতে ৩০ মিনিটের বেশি সময় লাগছে। এই অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনেক সময় হার্টে পর্যাপ্ত রক্ত চলাচল কমে যাওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ। বিশেষ করে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে এই সঙ্কেতটি বেশি মাত্রায় প্রকাশ পায়।
দ্বিতীয় সঙ্কেত হলো বুক জ্বালা এবং গলা ও চোয়ালে অস্বস্তি অনুভব হওয়া। বুকের ঠিক মাঝখানে একটা ভারী চাপ চাপ ভাব লাগতে পারে, যা দেখে মনে হতে পারে কেউ যেন বুকটি শক্ত করে চেপে ধরেছে। অনেকেই একে সাধারণ গ্যাসের ব্যথা ভেবে অ্যান্টাসিড বা গ্যাসের ওষুধ খেয়ে সাময়িক স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু এর সাথে যদি গলা, চোয়াল, ঘাড় বা পিঠের উপরের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এই ব্যথা কয়েক মিনিট থেকে শুরু করে দীর্ঘ আধ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ভুলেও এই লক্ষণটিকে অবহেলা করা উচিত নয়।
তৃতীয় সঙ্কেত হলো হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া এবং বিনা কারণে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া। অনেক সময় গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় এবং দম বন্ধ হয়ে আসছে এমন অনুভূতি হয়। আবার সাধারণভাবে বসে থাকা অবস্থাতেও হঠাৎ করে শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হতে পারে। এর পাশাপাশি যদি সারা গা ঠান্ডা ঘামে ভিজে যেতে শুরু করে, তবে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আবহাওয়া ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও যদি বিনা কারণে অতিরিক্ত ঘাম হয়, তবে বুঝতে হবে তা হৃৎপিণ্ডের জন্য একটি বড় অ্যালার্ম সিগন্যাল।
তাহলে এই পরিস্থিতিতে আপনার করণীয় কী? চিকিৎসকরা জোরালোভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন যে, এই ৩টি লক্ষণের মধ্যে যেকোনো ১টি বা ২টি একসঙ্গে যদি দীর্ঘদিন ধরে বা পরপর কয়েকদিন ধরে দেখা দেয়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে অবিলম্বে ইসিজি (ECG) এবং ট্রোপনিন টেস্ট (Troponin Test) করিয়ে নেওয়া উচিত। যাদের ইতিমধ্যেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তপ্রচাপের সমস্যা রয়েছে কিংবা যাদের পরিবারে জন্মগত হার্টের রোগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাত্রায় সতর্ক থাকা আবশ্যক। কারণ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যথার অনুভূতি কম অনুভূত হয়, যার ফলে সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়।
আমাদের হৃদপিণ্ড জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানা নিঃশব্দে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করে যায়। তাই তার দেওয়া এই ছোট ছোট শারীরিক সঙ্কেতগুলোকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। “এটা এমনিই ঠিক হয়ে যাবে” বা সাধারণ সমস্যা ভেবে দিনের পর দিন তা ফেলে রাখবেন না। সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয় হলে চিকিৎসা অনেক সহজ হয়। একটুখানি সচেতনতাই পারে আপনার এবং আপনার প্রিয়জনের অমূল্য জীবন বাঁচাতে।