মধ্যযুগীয় বর্বরতার ছায়া নেমে এল বিহারের পূর্ণিয়া জেলায়। ডাইনি সন্দেহে এক মর্মান্তিক উন্মত্ততার শিকার হয়ে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে বেধড়ক মারধর করে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করল একদল উত্তেজিত গ্রামবাসী। মুফাসিল থানা এলাকার তেতগামা গ্রামে ঘটা এই ভয়াবহ ঘটনায় নিহতরা হলেন বাবুলাল ওঁরাও, সীতা দেবী, মনজিৎ ওঁরাও, রানিয়া দেবী এবং তপাতো মোসমাত। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর থেকে গোটা গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে চরম আতঙ্ক, যার জেরে বহু বাসিন্দা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে খবর, গ্রামেরই এক ব্যক্তির সন্তান রহস্যজনকভাবে মারা যায় এবং তার অপর পুত্রও অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই ঘটনাকেই গ্রামবাসীরা ‘তন্ত্র-মন্ত্র’ ও ‘ডাইনি’র কাজ বলে ধরে নেয়। এরপরই তাদের অন্ধ কুসংস্কারের শিকার হয় ওই নিরীহ পরিবারটি। উন্মত্ত জনতা জোটবদ্ধ হয়ে প্রথমে পরিবারের সদস্যদের উপর পাশবিক আক্রমণ চালায়। তাদের বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর জখম করার পর জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় পাঁচজনকে। এই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখেও কেউ এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ।
ঘটনার খবর পেয়ে পূর্ণিয়া জেলা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ডগ স্কোয়াড এবং ফরেনসিক টিম নিয়ে শুরু হয়েছে ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত। গ্রামের কাছের একটি পুকুর থেকে ইতিমধ্যেই চারটি দগ্ধ দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ এই ঘটনায় নকুল কুমার নামের এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে, যাকে এই জনরোষে উস্কানি দেওয়ার মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিহত পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য ললিত কুমার এই মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, “আমার গোটা পরিবারকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। তারপর দগ্ধ দেহগুলো পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।” পুলিশ জানিয়েছে, যেহেতু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একটি শিশু মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত যে সে এখনো কোনো বয়ান দেওয়ার অবস্থায় নেই, তাই এখনো পর্যন্ত কোনো এফআইআর নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ শিশুটির মানসিক সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলে নিন্দা ও ক্ষোভ:
এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করেছেন আরজেডি (রাষ্ট্রীয় জনতা দল) নেতা তেজস্বী যাদব। তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রশাসনকে সরাসরি নিশানা করে বলেছেন, “অপরাধীরা সক্রিয়, মুখ্যমন্ত্রী অচেতন। ডিএনএ সরকার শুধু ভাগ করছে, পুলিশের অবস্থা শোচনীয়।” তেজস্বী যাদবের এই মন্তব্য বিহারের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং কুসংস্কার মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে দিল যে আধুনিক যুগেও অন্ধ কুসংস্কার কীভাবে মানুষের মধ্যে চরম হিংসা ও অমানবিকতার জন্ম দিতে পারে। প্রশাসন ও সমাজকর্মীরা এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের উপর জোর দিচ্ছেন।