বিশ্বমঞ্চে এবার বাঁকুড়ার ঐতিহ্য! জিআই তকমা পেল বিষ্ণুপুরের প্রাচীন ‘দশাবতার তাস’

বাঙালি ঐতিহ্যের মুকুটে যোগ হলো আরও এক অনন্য পালক। হুগলির মিষ্টির পর এবার বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের ঐতিহাসিক ‘দশাবতার তাস’ পেল জিআই (GI) ট্যাগ। মল্ল রাজাদের আমলে তৈরি এই বিলুপ্তপ্রায় শিল্পকর্ম এখন সরকারিভাবে স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশি বাঁকুড়ার শিল্পী মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। ঐতিহ্য এবং শিল্পকলার এক অপূর্ব মিশেল এই দশাবতার তাস, যা এবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে চলেছে।

বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর মানেই টেরাকোটা কিংবা মন্দির স্থাপত্যের কথা মনে পড়ে। কিন্তু এই শহরের বুক জুড়ে দীর্ঘ সময় ধরে যে শিল্পটি গোপনে লালিত হয়েছে, তা হলো হাতে তৈরি ‘দশাবতার তাস’। কথিত আছে, মল্ল রাজাদের আমলে যখন এই শিল্পের প্রসার ঘটে, তখন মুঘল দরবারের তাসের আদলে বিষ্ণুর দশটি অবতারকে কেন্দ্র করে এই তাস তৈরির রীতি চালু হয়েছিল। বিষ্ণুর দশটি অবতার, তাঁদের দশটি বাহন, দশটি অস্ত্র এবং দশটি প্রতীক নিয়ে মোট ১২০টি তাসের একটি সেট তৈরি করা হয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এই তাস আজও শিল্প রসিকদের কাছে বিস্ময়ের।

বিষ্ণুপুরের শাঁখারিবাজার এলাকার ফৌজদার পরিবার বংশপরম্পরায় এই তাস তৈরির ঐতিহ্যের বাহক। মল্ল রাজারা ছিলেন বৈষ্ণব ভাবধারার অনুরাগী, তাই এই তাসের প্রতিটি নকশায় সেই ধর্মীয় ও রাজকীয় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। এককালে বিষ্ণুপুরের ঘরে ঘরে এই তাস খেলার চল থাকলেও, সময়ের স্রোতে তা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে এই রাজকীয় খেলার নিয়মকানুন আজ প্রায় বিস্মৃত। বর্তমানে শিল্পী শীতল ফৌজদার-সহ হাতেগোনা কয়েকজন শিল্পী ছাড়া এর রহস্য আর কেউ জানেন না।

তবে জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় এই শিল্প নতুন করে অক্সিজেন পেল। শিল্পীরা মনে করছেন, এই ট্যাগ পাওয়ার ফলে তাসের চাহিদা বাড়বে এবং লুপ্তপ্রায় এই ঐতিহ্য বিশ্ববাজারে এক নতুন মাত্রা পাবে। হস্তশিল্পের প্রসারে সরকারি সাহায্য এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ এই শিল্পকে ফের তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিষ্ণুপুরের মানুষের কাছে এটি কেবল একটি তাস খেলা নয়, বরং মল্ল রাজবংশের সেই স্মৃতিচিহ্ন, যা তাদের মাটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জিআই তকমা পাওয়ার পর এখন দেখার বিষয়, শিল্পীরা কীভাবে এই ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন।