বিশ্বকর্মা পুজোয় শুধুই হাহাকার! কেন উৎসবের দিনে শ্মশানের মতো নীরব শতাব্দী প্রাচীন বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কারখানা?

একসময় শিল্পাঞ্চলে বিশ্বকর্মা পূজা মানেই ছিল বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কারখানার উৎসব। দুর্গাপূজাকেও ছাপিয়ে যেত সেই উন্মাদনা। কিন্তু আজ সেই কারখানায় শুধুই নীরবতা আর হাহাকার। এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই কারখানা এখন পোড়ো বাড়ির মতো দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একসময় ১৬ হাজার কর্মীর হাসি আর উৎসবের কোলাহল লেগে থাকত।
বার্ন স্ট্যান্ডার্ডের রমরমা থেকে পতনের ইতিহাস
১৯১৮ সালে স্থাপিত এই কারখানা শুরুতে ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড ওয়াগন’ নামে পরিচিত ছিল। রেলের ওয়াগন ও সরঞ্জাম তৈরিতে এর খ্যাতি ছিল। পরবর্তীকালে স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘মার্টিন অ্যান্ড বার্ন’ কোম্পানি এটিকে অধিগ্রহণ করলে এর নাম হয় বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কারখানা। ১৯৭৬ সালে এটি জাতীয়করণ করা হয়।
১৯৮৪ সালের পর থেকে রেলের খোলা টেন্ডার প্রথা চালু হলে বহু বেসরকারি কোম্পানি প্রতিযোগিতায় নামে। আধুনিকীকরণের অভাবে বার্ন স্ট্যান্ডার্ড প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে এবং লোকসানের মুখে পড়ে। ১৯৯৫ সালে এটিকে রুগ্ন কারখানা ঘোষণা করা হয়। ২০১০ সালে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এটিকে রেলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হলেও লাভ হয়নি। শেষমেশ ২০১৮ সালে, শতবর্ষ পূর্তির বছরেই, কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। স্থায়ী কর্মীদের ভিআরএস দেওয়া হয়, আর অস্থায়ী শ্রমিকদের বকেয়া টাকা এখনো বাকি।
বিশ্বকর্মা পুজোর জৌলুস এখন অতীত
একসময় বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কারখানায় ৭৪টি ইউনিটে আলাদাভাবে বিশ্বকর্মা পূজা হতো। এক বিভাগ অন্য বিভাগের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত কে কত সুন্দরভাবে পূজা সাজাতে পারে। প্রাক্তন কর্মী অসিত বাগ জানান, “বিশ্বকর্মা পূজা থেকেই কার্যত দুর্গাপূজার আমেজ শুরু হয়ে যেত। কারখানার কর্মীরা সপরিবারে আসতেন, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতেন এবং প্রতিটি কর্মীর বাড়িতে মিষ্টির প্যাকেট যেত।”
কিন্তু আজ সেইসব শুধুই স্মৃতি। ২০১৮ সালে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে সেখানে আর কোনো উৎসব হয় না। প্রাক্তন কর্মীরা এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিছু পরিবার এখনো শ্রমিক আবাসে থাকলেও বিদ্যুৎ ও জলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তাদের জীবন দুর্বিষহ।
বিশ্বকর্মা পূজার দিনে বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, একসময়ের উৎসবের জায়গাটি আজ শ্মশানের মতো নীরব। প্রাক্তন কর্মী অসিত বাগের কথায়, “বুক ডুকরে কেঁদে ওঠে। যে পূজা থেকে দুর্গাপূজার আনন্দ শুরু হয়ে যেত, আজ সেখানে কিছুই নেই।”