বিদেশের মাটিতে রবীন্দ্রনাথ! আন্তর্জাতিক পর্দায় আসছে বাংলার কালজয়ী তিন নৃত্যনাট্য নিয়ে মেগা প্রজেক্ট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী সৃষ্টিকে আধুনিক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নতুন এক রূপ দেওয়ার অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুরের ‘বিয়ন্ড বাউন্ডারিজ ক্রিয়েটিভ’। সিঙ্গাপুর, ভারত ও যুক্তরাজ্যের যৌথ ত্রয়ী উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র প্রকল্প হিসেবে তৈরি হতে চলেছে ‘দ্য টেগোর ট্রিলজি’ (The Tagore Trilogy)। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত তিনটি নৃত্যনাট্য ‘শাপমোচন’, ‘শ্যামা’ এবং ‘মায়ার খেলা’ থেকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সাংস্কৃতিক সহযোগী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ‘সিঙ্গাপুর টেগোর সোসাইটি’।

এই ট্রিলজিতে একে একে মুক্তি পাবে তিনটি স্বতন্ত্র ইংরেজি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি— ‘সোল বাউন্ড’ (Soul Bound), ‘সোল লস্ট’ (Soul Lost) এবং ‘সোল ফাউন্ড’ (Soul Found)। রবীন্দ্রনাথের ভিন্ন স্বাদের সৃষ্টি থেকে মূল ভাবনা নেওয়া হলেও ছবিগুলির চিত্রনাট্য ও প্রেক্ষাপট বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন বাস্তবসম্মত সামাজিক ও মানবিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে। আজকের দিনে প্রবাস জীবন, বাস্তুচ্যুতি, পরিচয়ের সংকট, আপন হওয়ার তীব্র আকوع, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা, ভালোবাসা এবং সর্বোপরি মানবতার সন্ধান—এই গভীর বিষয়গুলিই পরতে পরতে ফুটে উঠবে তিনটি ছবিতে।

প্রযোজক ড. মনোজিৎ সেন এই প্রসঙ্গে জানান, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধুমাত্র একটি অঞ্চলের নন, তিনি গোটা বিশ্বের। The Tagore Trilogy-র মাধ্যমে আমরা তাঁর বিশ্বজনীন মানবতাবাদের বিশ্বাসকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। প্রবাস ও স্থায়িত্বের মতো আজকের যুগের নানান চ্যালেঞ্জের আলোয় তাঁর কাজকে নতুন করে দেখে বর্তমান প্রজন্ম। আমরা গভীর আশাবাদী যে এই উদ্যোগ মানুষকে মনে করাবে আজকের দিনে ঠাকুরের ভাবনা আরও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক, এবং মানবতার সবচেয়ে বড় সংকটগুলির সমাধানে তিনি আজও আশা ও প্রজ্ঞার দিশা দেখান।”

ছবিগুলির রূপরেখা অনুযায়ী, প্রতিটি চলচ্চিত্র আলাদাভাবে একটি সম্পূর্ণ গল্প ফুটিয়ে তুলবে। তবে তিনটি ছবিকে এক সুতোয় বাঁধলে বাস্তুচ্যুতি থেকে আত্ম-আবিষ্কার এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সংযোগ গড়ে ওঠার একটি বৃহত্তর যাত্রার ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই আন্তর্জাতিক ট্রিলজির প্রথম ছবিটি ২০২৭ সালের মে মাসে বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বসঙ্গীত, ভিন্নধর্মী ভিজ্যুয়াল আর্ট এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির চরিত্রকে নিখুঁতভাবে একত্রিত করে তাঁর ভাবনার এক সমকালীন ও আধুনিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা থাকবে এই চলচ্চিত্রগুলিতে।

সঙ্গীত পরিচালক বিক্রম ঘোষ বলেন, “এটি একটি দারুণ এবং অত্যন্ত ব্যতিক্রমী প্রজেক্ট, যা অরিন্দম দে আমার কাছে নিয়ে আসেন। এটি একটি সত্যিকারের আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট যেখানে ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং ভারতবর্ষ এক সুতোয় একাকার হচ্ছে। এই সাবজেক্টটা আমার কাছে ভীষণ ইন্টারেস্টিং লেগেছে। আমাদের অনেক রকম অভিনব পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশি ও ভারতীয় গুণী শিল্পীদের দিয়ে গান গাওয়ানো হবে, যা এমন এক অবিশ্বাস্য সাউন্ড স্কেপ তৈরি করবে যা এর আগে সিনেমাতে কেউ দেখেনি।”

‘Beyond Boundaries Creative, Singapore’-এর প্রধান উদ্যোগে নির্মিত এই ট্রিলজির সার্বিক পরিচালনা ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন চলচ্চিত্রকার অরিন্দম দে। প্রযোজনায় যৌথভাবে রয়েছেন ড. মনোজিৎ সেন। সৃজনশীল সহযোগিতায় যুক্ত হয়েছেন প্রখ্যাত সুরকার বিক্রম ঘোষ এবং বিশিষ্ট শিল্পী ও চিত্রকর হিরণ মিত্র। শিক্ষা ও সৃজনশীল সহযোগী হিসেবে রয়েছে যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য ‘Bath Spa University’। এ ছাড়া প্রযোজনা সহায়তায় যুক্ত রয়েছে ‘Candid Communications UK’ এবং ভারতের ‘NH13 Films’।

পরিচালক অরিন্দম দে তাঁর ভাবনায় স্পষ্ট করেছেন, “আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি কখনও অন্ধ ছিলাম না, তবু তাঁর কাজ আমাকে শিখিয়েছে একজন প্রকৃত মানুষ হওয়ার অর্থ কী। তিনি দেখিয়েছেন বিপরীত সত্য কীভাবে একসঙ্গে থাকতে পারে। শাপমোচন, শ্যামা ও মায়ার খেলা থেকে অনুপ্রাণিত এই ট্রিলজি প্রবাস, পরিচয়, ভালোবাসা ও আপন হওয়ার আসল গল্প বলবে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গুণী শিল্পীদের নিয়ে আমরা এমন এক সাংস্কৃতিক বিনিময় উদযাপন করতে চাই যেখানে বৈচিত্র্য নিজস্বতা না হারিয়েও একে অন্যকে সমৃদ্ধ করে।”

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty