বঙ্গ বিজেপির কাছে ‘৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেন’ কেবল একটি ঠিকানা নয়, এটি একটি আবেগের নাম। রাজনৈতিক লড়াইয়ের আঁতুড়ঘর। উত্তর কলকাতার সেই ঐতিহাসিক বাড়িতেই এবার তৈরি হতে চলেছে ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা তথা বিজেপির প্রাণপুরুষ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে বিশেষ সংগ্রহশালা ও লাইব্রেরি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, পার্টি বড় হয়েছে, সদর দফতরও বদলেছে, কিন্তু যে মাটিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্পর্শ লেগে রয়েছে, সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের হৃদয়ের নাড়ির টান অবিচ্ছেদ্য।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও সংযোগ
১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মুরলীধর সেন লেনের এই বাড়িটির সঙ্গে বিজেপির পথচলা শুরু। ১৯৮০ সালে বিজেপির পথচলা শুরুর পর থেকে দীর্ঘ সময় এই বাড়িটিই ছিল রাজ্য বিজেপির সদর দফতর। শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “যখন দলের ভোট শতাংশ ছিল মাত্র ১%, যখন রাজনৈতিক মহলে বিজেপিকে গুরুত্বই দেওয়া হতো না, তখন এই বাড়িটিই ছিল আমাদের একমাত্র সম্বল।” এই চার দেওয়ালের মধ্যেই অটল বিহারী বাজপেয়ী, হরিপদ ভারতী, বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী, তপন শিকদার ও সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রবাদপ্রতিম নেতাদের সংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, এই বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ। একসময় এখানে অমৃত সমাজের অফিস ছিল। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কেশব সেনের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের পদধূলি পড়েছে এই বাড়িতে। এমনকি দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং জগজীবন রামও একসময় এই বাড়িতে ভাড়া থেকেছেন। বাস্তুহারা সহায়তা সমিতির হাত ঘুরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই বাড়িটি জনসংঘের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেন।
সংগ্রহশালার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
৭৫ বছরের দীর্ঘ সাধনা এবং বহু রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর আজ রাজ্যে বিজেপির উত্থান হয়েছে। সেই সাফল্যের দিনে দাঁড়িয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই বাড়িটিকে একটি মিউজিয়াম ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে গেরুয়া শিবির। এই সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত থাকবে শ্যামাপ্রসাদের কর্মময় জীবন, তাঁর জাতীয় রাজনীতির ওপর প্রভাব এবং বঙ্গ বিজেপির দীর্ঘ পথচলার নথিবদ্ধ ইতিহাস। শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেছেন, পার্টি বড় বাড়িতে স্থানান্তর হলেও, মুরলীধর সেন লেনের এই আদি ঠিকানাকে তারা কোনোভাবেই অবহেলা করতে পারেন না।
এই সংগ্রহশালা সাধারণ কর্মী এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হয়ে উঠবে। শ্যামাপ্রসাদের স্বপ্নপূরণের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁর কাজ ও আদর্শকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি রাস্তার এই ছোট বাড়িটিই আজ বিজেপির কাছে পরম তীর্থস্থান। আগামী দিনে এই সংগ্রহশালা বিজেপির ত্যাগের রাজনীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেবে দেশবাসীকে।





