বাবার গুলিতে জাতীয় টেনিস তারকার রহস্যজনক মৃত্যু, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বাড়ছে ধোঁয়াশা

জাতীয় স্তরের টেনিস খেলোয়াড় রাধিকা যাদবের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে গোটা দেশ স্তম্ভিত। গত ১০ জুলাই গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৭-এর বাড়িতে নিজের মায়ের জন্মদিনের জন্য খাবার তৈরি করার সময় বাবা দীপক যাদবের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। প্রথমদিকে পেছন থেকে গুলি চালানোর কথা বলা হলেও, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী রাধিকাকে সামনে থেকে চারটি গুলি করা হয়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং সমাজের গভীর ক্ষত এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার এক ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরেছে।

“মেয়ের টাকায় খায়” – এই অপবাদই কি খুনের কারণ?
পুলিশের কাছে দেওয়া বয়ানে দীপক যাদব দাবি করেছেন, রাধিকাকে নিয়ে গ্রামের মানুষের নানা কটূক্তিই তাকে এই চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। তার অভিযোগ, গ্রামের লোকেরা বলত “দীপক মেয়ের রোজগারে বেঁচে আছে” এবং রাধিকার চরিত্র নিয়েও নানা গুজব ছড়াত। এই সমস্ত অপবাদ তার কাছে ‘অসম্মানজনক’ মনে হয়েছিল।

তবে, দীপকের এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন সফল টেনিস খেলোয়াড়, যিনি নিজের টেনিস অ্যাকাডেমি চালাতেন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতেও বেশ জনপ্রিয় ছিলেন, এমনকি সম্প্রতি একটি মিউজিক ভিডিওতেও (করওয়ান) দেখা গিয়েছিল, তার এমন সাফল্য কি সত্যিই একজন বাবার জন্য অপমানের কারণ হতে পারে? নাকি একজন নারীর আত্মনির্ভরতা, খ্যাতি এবং স্বাধীনতাকে সমাজের একটি অংশ মেনে নিতে পারে না, তারই প্রতিফলন এটি?

সাফল্যই কি কাল হলো রাধিকার?
রাধিকা যাদব ছিলেন একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং স্বাধীনচেতা তরুণী। খেলাধুলার প্রতি তার আবেগ ছিল অপরিসীম। দীপক যাদব বারবার রাধিকাকে তার অ্যাকাডেমি বন্ধ করার কথা বলতেন, যা রাধিকা কখনোই মেনে নেননি। এই বিষয়টি কি তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল? সমাজের তথাকথিত ‘সম্মান’-এর অজুহাতে একজন বাবা কি তার মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দিলেন?

মায়ের জন্মদিন, নাকি এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা?
ঘটনার দিন ছিল রাধিকার মা মঞ্জু যাদবের জন্মদিন। রাধিকা নিজের হাতে মায়ের জন্য বিশেষ কিছু তৈরি করছিলেন। ঠিক তখনই রান্নাঘরে প্রবেশ করে দীপক যাদব এবং পরপর গুলি চালায়। প্রথমে তিনটি গুলির কথা বলা হলেও, ময়নাতদন্তে রাধিকার বুকে চারটি গুলি লাগার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে এবং তা সামনে থেকে চালানো হয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঘটনার সময় রাধিকার মা মঞ্জু যাদব অসুস্থ থাকায় ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন। পুলিশ বারবার জিজ্ঞাসা করলেও তিনি কোনো লিখিত বয়ান দেননি এবং শুধু বলেছেন, “আমি জানি না দীপক কেন এমনটা করল।” এই নীরবতা কি কোনো রহস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

তদন্তে অসঙ্গতি এবং প্রশ্নচিহ্ন
পুলিশের এফআইআর এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের মধ্যে বড়সড় অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। একদিকে বলা হচ্ছে পেছন থেকে গুলি চালানো হয়েছে, অন্যদিকে মেডিক্যাল রিপোর্টে সামনে থেকে গুলি লাগার কথা বলা হচ্ছে। তাহলে আসল ঘটনা কী? দীপক কি সত্যিই রাধিকার মুখোমুখি হয়ে গুলি চালিয়েছিল? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর চক্রান্ত রয়েছে?

রাধিকা যাদবের মৃত্যু কেবল একটি মর্মান্তিক খুনের ঘটনা নয়, এটি সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আজও নারীদের সাফল্য, আত্মনির্ভরতা এবং খ্যাতিকে মেনে নিতে সমাজের একটি বড় অংশ কতটা দ্বিধাগ্রস্ত। এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করল যে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। রাধিকা যাদবের বাবা যে দাবিগুলি করেছেন, তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আগামী দিনে তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy