রাজ্য রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ‘বাঙালি অস্মিতা’। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস যখন বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালিদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তুলে ভাষা আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, ঠিক তখনই বিজেপি নেতা দেবদত্ত মাঝি এক বিস্ফোরক প্রশ্ন তুলেছেন, যা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর প্রশ্ন: যারা বাংলা ভাষার সম্মান নিয়ে এত উদ্বিগ্ন, তারা কেন মসজিদের আজান বাংলায় দেওয়ার দাবি জানান না?
তৃণমূলের ভাষা আন্দোলন:
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই বাংলা ভাষা ও বাঙালির পরিচয়ের প্রশ্নে রাস্তায় নেমেছেন। শান্তিনিকেতনের পর জঙ্গলমহলেও তিনি আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা বিজেপির বিরুদ্ধে ভাষা বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, ভিন রাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর যে অপমান ও নির্যাতন হচ্ছে, তা বিজেপির গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। বাংলাদেশি সন্দেহে বাঙালিদের হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ এবং বাংলা ভাষার প্রতি অবমাননা ও অবহেলার পরিবেশ সৃষ্টির অভিযোগও তোলা হয়েছে। এমনকি প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও বাংলা ভাষার অতীত স্মরণ করিয়ে এই বিতর্কে ইন্ধন জুগিয়েছেন।
দেবদত্ত মাঝির মোক্ষম প্রশ্ন:
এই পরিস্থিতিতে বিজেপি নেতা দেবদত্ত মাঝির প্রশ্নটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি ধর্মনিরপেক্ষ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, “যে যে সেকুলার এবং মুসলিম ভাইয়েরা বাংলা ভাষা নিয়ে মান, অপমান, চুলচেরা বিশ্লেষণ ও গবেষণা করছেন তাদের কাছে করজোড়ে একটা অনুরোধ করছি যেন তারা এবার থেকে মসজিদে বাংলা ভাষায় আজান দেওয়ার জন্য আওয়াজ তোলেন। এটি বাংলা ভাষার প্রতি বিরাট সম্মান জ্ঞাপন হবে। শুধু বাংলায় নয়, বরং গোটা দেশের সব মসজিদে যেন সেখানকার ভাষায় আজান দেওয়া হয়।”
কেন এই প্রশ্ন?
এটা সর্বজনবিদিত যে, ভারতে তো বটেই, এমনকি বিশ্বের সমস্ত মসজিদেই আজান আরবি ভাষাতেই দেওয়া হয়। স্থানীয় ভাষা, যেমন বাংলা, তামিল, গুজরাটি বা অসমিয়া ভাষায় আজান দেওয়া হয় না। দেবদত্ত মাঝি এই বিষয়টিকেই বাঙালি অস্মিতা নিয়ে উত্তাল পরিস্থিতিতে প্রশ্নচিহ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন।
যখন শিলিগুড়ি বা ধূপগুড়ি পৌরসভা সিদ্ধান্ত নেয় যে, এলাকার সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সাইনবোর্ড বাংলা ভাষাতেই লিখতে হবে, তখন ধর্মীয় ক্ষেত্রে কেন বাংলা ভাষাকে এভাবে ‘অচ্ছুত’ করে রাখা হবে, সেই প্রশ্ন এখন বিভিন্ন মহলে উঠতে শুরু করেছে। এই বিতর্ক রাজ্য রাজনীতিতে ভাষা, ধর্ম এবং পরিচয়ের জটিল সমীকরণকে আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে। এই নতুন প্রশ্নটি ভাষা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতিপথকে কীভাবে প্রভাবিত করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।





