বাঙালির ফেভারিট বসিরহাটের কাঁচাগোল্লা এবার বন্ধের মুখে? চিনির রেকর্ড দামে মাথায় হাত মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের!

বিভূতিভূষণের অমর লেখনী থেকে শুরু করে অবিভক্ত বাংলার ভোজনরসিক বাঙালির রসনা তৃপ্তিতে কাঁচাগোল্লার নাম সবসময়ই অগ্রগণ্য। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের বিখ্যাত এই কাঁচাগোল্লার সুনাম শুধু রাজ্য বা দেশেই নয়, ছড়িয়ে রয়েছে ভিনরাজ্যেও। কিন্তু আসন্ন দুর্গাপুজোর ঠিক আগে বড়োসড়ো সংকটের মুখে পড়েছে এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি শিল্প। হু হু করে চিনির দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে কাঁচামালের পর্যাপ্ত সরবরাহের ঘাটতির কারণে একদিকে যেমন উৎপাদন তলানিতে এসে ঠেকেছে, তেমনই অন্যদিকে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে এই মিষ্টির দাম। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই স্বাদের নিখাদ আনন্দ উপভোগ করতে এখন সাধারণ ক্রেতাদের পকেট থেকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
মিষ্টি ব্যবসায়ীদের মারাত্মক উদ্বেগ ও উৎপাদন হ্রাস
বসিরহাটের প্রবীণ মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লা তৈরির মূল চাবিকাঠি হলো ছানা ও চিনির সঠিক অনুপাত। প্রায় ১০ কেজি ছানার সঙ্গে সুস্বাদু কাঁচাগোল্লা তৈরি করতে অন্তত ৪ কেজি চিনির প্রয়োজন হয়। শীতের মরশুমে আবার খাঁটি নলেন গুড়ের সঙ্গে চিনি মিশিয়েও এই বিশেষ মিষ্টি প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারে চিনির মূল্যবৃদ্ধি এবং এর লাগাতার সরবরাহ সংকটের কারণে কারিগররা উৎপাদন খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, অতীতে যে সমস্ত দোকানে প্রতিদিন নিয়মিত ৬০ কেজি পর্যন্ত কাঁচাগোল্লা তৈরি হতো, বর্তমান সংকটের জেরে তা নেমে এসেছে মোটে ২০ কেজিতে। এমনকি বহু বড় দোকানে কুইন্টাল কুইন্টাল মিষ্টির উৎপাদন কমে অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোথাও বাধ্য হয়ে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কেজি কাঁচাগোল্লা তৈরি করেই দিনের কাজ গুটিয়ে নিতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। পূর্বে যে কাঁচাগোল্লার প্রতি কেজির দাম ছিল প্রায় ২৫০ টাকা, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ টাকায়। দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় অনেক ক্রেতাই আগের তুলনায় অনেক কম পরিমাণে মিষ্টি কিনছেন, যা ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় বড় ধাক্কা দিচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ও জিআই স্বীকৃতির দাবি
মিষ্টি প্রস্তুতকারক ও কারিগরদের অভিযোগ, খোলা বাজারে চিনির জোগান অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কখনো চড়া দামে, আবার কখনো নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে তাঁদের চিনি কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে, যার ফলে সঠিক উৎপাদনের বাজেট তৈরি করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও বসিরহাটের ঐতিহ্যবাহী এই কাঁচাগোল্লার গৌরব ও মান বজায় রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই বসিরহাটের এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জিআই’ (GI) বা ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতির জোরালো দাবি তোলা হয়েছিল। বর্তমান এই অর্থনৈতিক চাপ ও কাঁচামাল সংকট কাটিয়ে ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লা তার পুরনো রমরমা ফিরিয়ে আনতে পারে কি না এবং রাজ্য প্রশাসন এই সংকটে মিষ্টান্ন শিল্পের পাশে দাঁড়ায় কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।