বাঙালির পাতে এবার পুকুরের ইলিশ! কাকদ্বীপের গবেষণায় মিলল বড় সাফল্য, আর কত দেরি?

বাঙালি এবং ইলিশ—এই দুটি নাম একে অপরের পরিপূরক। বর্ষা মানেই পাতে ইলিশের হাতছানি, কিন্তু সুস্বাদু ইলিশের জন্য বছরের নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষায় থাকতে হয় ইলিশপ্রেমীদের। তবে খুব শীঘ্রই সেই প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। সারা বছর যাতে ইলিশ মাছ পাওয়া যায়, সেই লক্ষ্যেই পুকুরে ইলিশ চাষ নিয়ে জোরকদমে গবেষণা চালাচ্ছে কাকদ্বীপের কেন্দ্রীয় নোনা জলজীব পালন অনুসন্ধান সংস্থা (ICAR-CIBA)। ইলিশের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই পঞ্চম ধাপের সাফল্য মিলেছে। বর্তমানে প্রকল্পের শেষ তথা ষষ্ঠ ধাপের গবেষণা শুরু হয়েছে, যা সফল হলেই সাধারণের পুকুরে ইলিশ চাষের পথ প্রশস্ত হবে।

পুকুরে ইলিশ চাষের এই স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। দীর্ঘ দশ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় মৎস্য বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ইলিশ মাছের স্বাভাবিক জীবনচক্র ও বংশবিস্তারের পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন। পঞ্চম ধাপের গবেষণার ফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক; এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা পুকুরের জলে ৯৮২ গ্রাম ওজনের ইলিশ সফলভাবে বড় করে তুলতে পেরেছেন। তবে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত সাফল্য তখনই আসবে, যখন কৃত্রিমভাবে ডিম থেকে পোনা ফোটানোর প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি আয়ত্ত করা যাবে। এই প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করেই এখন শেষ ধাপের গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে।

এই প্রকল্পের চূড়ান্ত সাফল্য নিশ্চিত করতে মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রে আধুনিক প্রযুক্তির ‘স্যালিনিটি গ্রেডিয়েন্ট রিসার্কুলেটরি অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম’ (RAS) উদ্বোধন করা হয়েছে। শনিবার সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী দীপঙ্কর জানা এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটির উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইসিএআর-সিবার অধিকর্তা ডঃ কুলদীপ কে লাল এবং কাকদ্বীপ গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ডঃ দেবাশীষ দে। প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি এই প্রকল্পটি ইলিশ গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের খুঁটিনাটি নিয়ে আইসিএআর-সিবার মুখ্য বিজ্ঞানী ডক্টর দেবাশীষ দে জানান, পরিবেশগতভাবে বিভিন্ন পদ্ধতি সমন্বয় করে এই প্রকল্পটি সাজানো হয়েছে। এখানে তিনটি পাতকুয়ায় তিন রকমের লবনাক্ততার জল রাখা হয়েছে, যা বৈদ্যুতিক পাম্পের সাহায্যে সার্কুলেট করা হয়। ইলিশের পোনাদের বিকাশের জন্য জলের উষ্ণতা, দূষণমুক্ত পরিবেশ এবং স্রোত—সবই কৃত্রিমভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে। মৎস্য বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই বিশেষ পরিবেশে ইলিশের পোনাগুলোর ওপর অন্তত এক বছর ধরে নিবিড় নজরদারি চালানো হবে। যদি এই ষষ্ঠ ধাপের পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি উত্তীর্ণ হতে পারেন, তবে আগামী দিনে ব্যক্তিগত পুকুর বা ছোট জলাশয়ে ইলিশ চাষ করা সম্ভব হবে। এর ফলে বাজারে ইলিশের জোগান বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে পুকুরের টাটকা ইলিশ কিনতে পারবেন। বাঙালির প্রিয় ইলিশ এখন আর কেবল নদীর ওপর নির্ভরশীল থাকবে না, বরং ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে সাধারণের পুকুরঘাট পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার অপেক্ষায়।