বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরানোর নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর, কর্মশ্রী ও আবাসন প্রকল্পে পুনর্বাসনের ঘোষণা

ভিনরাজ্যে হেনস্থার শিকার বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের দ্রুত রাজ্যে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ বোলপুরের গীতাঞ্জলি প্রেক্ষাগৃহে প্রশাসনিক বৈঠকে তিনি ঘোষণা করেন যে, যারা ফিরতে চাইবেন, তাদের কর্মশ্রী প্রকল্পের আওতায় জব কার্ড করে কাজের ব্যবস্থা করা হবে। এমনকি, যাদের বাড়ি নেই, তাদের জন্য শিবির তৈরি করে থাকার ব্যবস্থাও করা হবে। এই গুরুদায়িত্ব পালনের ভার দেওয়া হয়েছে রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম এবং মন্ত্রী মলয় ঘটকের ওপর।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে। কিছু দালালের পাল্লায় পড়ে তারা বাংলার বাইরে যাচ্ছে। কিন্তু অত্যাচারের সময় তারা থাকছে না। দরকার নেই আমার বাইরে কাজ করে।” তিনি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ তুলে বলেন, “বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলা ভাষায় কথা বললেই মারছে। এরা শিশু থেকে মহিলা কাউকে ছাড়ছে না। হরিয়ানা, গুরগাঁওতে ১০টা ডিটেনশন ক্যাম্প করে আটকে রাখা হয়েছে।”

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য মুখ্যসচিবের সঙ্গে আলোচনা করে একটি বিশেষ প্রকল্প তৈরির নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “মুখ্যসচিবের সঙ্গে কথা বলে স্কিম তৈরি করে যারা আসতে চায় তাদের আমরা ফিরিয়ে আনবো। তারা ফিরে এলে, বাড়ি থাকলে ভালো, না হয় ক্যাম্প করে দেব। এরপর তাদের রেশন কার্ড, স্বাস্থ্য সাথী কার্ড করে দেওয়া হবে। প্রত্যেকের জব কার্ড করে দেওয়া হবে, যাতে তারা কাজ পায়।” কেন্দ্র সরকার ১০০ দিনের কাজ এবং বাংলা আবাস, রাস্তার কাজ বন্ধ করে দিলেও রাজ্য সরকার এই প্রকল্পগুলি নিজস্ব উদ্যোগে চালাচ্ছে বলে তিনি জানান। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “বাংলাতেও দেড় কোটি পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছে অন্য রাজ্যের। আমার কিন্তু তাদের সঙ্গে সেরকম ব্যবহার করি না।”

নির্বাচন কমিশন ও বিএলও-দের প্রতি বার্তা

নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জেলাশাসক এবং বিএলও (বুথ লেভেল অফিসার)-দের প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন। তিনি বলেন, “রাজ্য থেকে এক হাজার লোক দিল্লি নিয়ে গিয়েছে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি জানতাম না। জেলা শাসকদের উচিত ছিল আমাকে, কিংবা মুখ্যসচিবকে জানানো। কিন্তু আপনারা আমাদের না জানিয়ে হুটহাট করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কখনো তো এই জিনিস হয়নি। ভয় দেখাচ্ছে? ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকুন। মানুষের স্বার্থে সব সময় কাজ করে যেতে হবে।” বিএলও-দের উদ্দেশে তিনি নির্দেশ দেন, “আপনারা দেখবেন ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম যেন বাদ না যায়। মনে রাখবেন নির্বাচনের নির্ঘন্ট প্রকাশের পর নির্বাচনের দায়িত্ব কমিশনের হাতে যায়। তার আগে রাজ্য সরকার, পরে আবার রাজ্য সরকার। সুতরাং আপনারা মনে রাখবেন চাকরি করেন রাজ্য সরকারের অধীনে। কোনো মানুষকে অযথা হয়রানি করবেন না। দীর্ঘদিন যারা ভোটার তাদের অস্তিত্ব আছে কিনা দেখবেন।”

উন্নয়নমূলক কাজ ও অনুব্রত মণ্ডলের উপস্থিতি

পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদকে ছোট ছোট কাজগুলো করার নির্দেশ দেন মমতা। তিনি বলেন, “বড় কাজ সরকার করবে। আপনারা ছোট ছোট কাজগুলো করুন। বিল্ডিং বেশি বানাবেন না। রাস্তা, আলো, পানীয় জলের ব্যবস্থা করুন। স্কুল কিংবা আইসিডিএস সেন্টারের ছাদ ফুটে জল পড়লে সেটা মেরামত করুন।”

বীরভূম জেলার উন্নয়নের তথ্য তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ১৩৫০টি প্রকল্পের মধ্যে ১২২৭টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে, যা ৯১ শতাংশ। বাকি ১২৩টি প্রকল্পের কাজ সময়ে শেষ হয়নি, যার মধ্যে ৪৬টি শিক্ষা দফতরের কাজ। জেলাশাসককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “বীরভূম জেলায় পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। কর্মশ্রী প্রকল্পে বীরভূম সব থেকে কম ৩২ দিন কাজ পেয়েছে।”

কয়লাখনি প্রসঙ্গে মমতা দেউচা পাঁচমিতে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেন, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লাখনি হিসেবে দেউচাকে চিহ্নিত করে তিনি জানান, ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এলাকার উন্নয়ন এবং হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। ৩১৪ একর জমিতে কালো পাথর তোলার জন্য ই-টেন্ডার করা হচ্ছে এবং খয়রাসোলের বিনোদপুরে ১৩৪৭ একর জমির উপর কয়লা উত্তোলনের জন্য একটি বেসরকারি সংস্থাকে ‘প্রসপেক্টিভ মাইনিং লিজ’ দেওয়া হয়েছে। জয়দেব কোল ব্লকেও ‘মাইনিং লিজ’ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সভার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অনুব্রত মণ্ডলের (কেষ্ট) উপস্থিতি। তাকে নিয়ে জল্পনা থাকলেও, সভার প্রথম সারিতেই তাকে দেখা যায়। মুখ্যমন্ত্রী আমোদপুর সুগার মিলকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে বলেন, “তাতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কেষ্ট আমাকে এনিয়ে কয়েকবার বলেছে।”

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy