বাংলার জলে অতন্দ্র প্রহরী, কলকাতা রিভার ট্রাফিক পুলিশ, যাদের ইতিহাস ৫০০ বছরের পুরনো

কলকাতার বুকে একমাত্র রিভার ট্রাফিক পুলিশ বা জলপুলিশের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং বহুমুখী দায়িত্বে সমৃদ্ধ। ব্রিটিশ আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই বিশেষ পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল। সেই থেকে আজও গঙ্গার জলে অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করে চলেছে এই বাহিনী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের গঠন ও কাজের ধরন অনেক বদলেছে, কিন্তু তাঁদের ঐতিহ্য আজও অম্লান।


ঐতিহ্য ও ইতিহাস

১৭ শতকের শেষের দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধ বাড়তে থাকে। এই সমস্যা মোকাবিলায় প্রথম জলপুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা চিন্তা করেন কুমোরটুলির ডেপুটি জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র। তিনি জলদস্যুদের আটকাতে বিভিন্ন নদী-নালায় ‘লক গেট’ এবং গঙ্গার বুকে লোহার শেকলের বেড়া বসিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশ আমলে বন্দরের অধীনে জলপুলিশের কাজ শুরু হয়। নদীপথে নৌকায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ, মালবাহী নৌকায় ডাকাতি ঠেকানো, মৎস্যজীবী ও শ্রমিকের ওঠানামায় নজরদারি করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। পরবর্তীতে এটি কলকাতা পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।


গঠন: অতীত ও বর্তমান

আগে রিভার ট্রাফিক পুলিশের স্বাভাবিক কাঠামোয় নয় জন অফিসার, ১৮ জন পিয়োন, ৯২ জন মাঝি এবং নয়টি টহলদারি নৌকা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব বেড়েছে এবং সেই অনুযায়ী বাহিনীও অনেক শক্তিশালী হয়েছে।

বর্তমানে এই ইউনিটে রয়েছেন ইন্সপেক্টর, সার্জেন্ট, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর, মাঝি, ডাণ্ডি ও অন্যান্য পদমর্যাদার ৪৯ জন সদস্য। এছাড়াও স্পিডবোট চালক, জেট স্কি চালক, প্রশিক্ষিত ডুবুরি এবং কলকাতা পুলিশের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীও এই ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত।


কাজের ধরনে পরিবর্তন

একসময় জলপুলিশের প্রধান দায়িত্ব ছিল নদীপথে ডাকাতি আটকানো এবং নৌকাবিরোধ মেটানো। কিন্তু বর্তমানে তাদের কাজের ধরন আমূল বদলেছে। এখন নদীর তলিয়ে যাওয়া থেকে মানুষকে বাঁচানো, ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধার, জলশোধন কেন্দ্র পাহারা দেওয়া, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎসবের সময় ভিড় সামলানো তাদের প্রধান দায়িত্ব।

কলকাতা রিভার ট্রাফিক পুলিশের ওসি ইন্দ্র চৌধুরী জানান, “এখন আমরা মূলত উদ্ধারকাজ করে থাকি। শুধুমাত্র মধ্য কলকাতাতেই এই বাহিনী রয়েছে বলে আমরা বেঙ্গল পুলিশ এবং জেলা পুলিশকেও সাহায্য করি। এছাড়াও আমাদের নানা দায়িত্ব রয়েছে।”

আগে দাঁড় টানা নৌকার বদলে এখন এসেছে মোটরচালিত লঞ্চ, জেট স্কি, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত ডুবুরিরা। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সাহায্যে এই বাহিনী এখন আরও দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy