বাংলাদেশে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে হাম ও ডেঙ্গু! ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেল ৪ শিশুর, লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা!

বাংলাদেশে বর্তমানে হামের প্রকোপ এক অত্যন্ত ভয়াবহ ও সংকটজনক রূপ ধারণ করেছে, যা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রতিবেশী এই দেশে হামে আক্রান্ত হওয়ার লাফিয়ে বাড়া পরিসংখ্যান এখন রীতিমতো আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শুধুমাত্র হামের উপসর্গ ও সংক্রমণ নিয়ে নতুন করে আরও চার শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে হামে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যুর মোট সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে মর্মান্তিক ৭৮৮টিতে। বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আরও চারজনের মৃত্যুর নেপথ্যেও হামের প্রাণঘাতী সংক্রমণের জোরালো আশঙ্কাই করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত সংগৃহীত ও পর্যালোচিত তথ্য বলছে যে, মোট ৬৯৩টি মৃত্যুর নেপথ্যে হামের পরোক্ষ প্রকোপ রয়েছে বলেই চিকিৎসকরা মনে করছেন, অন্যদিকে ৯৫টি মৃত্যুর ক্ষেত্রে এটি নিশ্চিতভাবেই হামের জন্যই ঘটেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়, গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশে নতুন করে ৯৩৮ জন হামের সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর ফলে দেশজুড়ে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে পৌঁছে গেছে ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৬৪৮টিতে। একই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আরও ১১৩ জনের শরীরে পরীক্ষাগারের মাধ্যমে হামের সংক্রমণ নিশ্চিতভাবে ধরা পড়েছে, যার জেরে দেশে ল্যাবরেটরি-নিশ্চিত আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৩১ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ১ লক্ষ ১৩৭ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে আশার কথা এই যে, তাঁদের মধ্যে ৯৬ হাজার ৫২১ জন রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করে ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

তবে এই পরিস্থিতির মাঝেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মনে নতুন করে ভীতি সঞ্চার করেছে ডেঙ্গুর হু হু করে বাড়তে থাকা দাপট। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, হামের প্রকোপ পুরোপুরি প্রশমিত হওয়ার আগেই যদি ডেঙ্গু সংক্রমণ একইভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তবে তা দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ওপর মারাত্মক ও অসহ্য চাপ সৃষ্টি করবে। বর্তমানে ঢাকার বড় বড় সরকারি হাসপাতালগুলি প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক হামের রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যেই ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বৃদ্ধি পেলে সীমিত স্বাস্থ্য পরিষেবার ওপর অতিরিক্ত ও লাগামছাড়া চাপ তৈরি হতে বাধ্য। বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রায় ৪৮ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর প্রায় ৭২ শতাংশই সংঘটিত হয়েছে একা জুন মাসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার মৌসুমে জমে থাকা জলে এডিস মশার বংশবিস্তার অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ঘটে থাকে, যার ফলে সঠিক সময়ে কড়া পদক্ষেপ না নিলে জুলাই ও আগস্ট মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী জানিয়েছেন যে, হামের রোগীর সংখ্যা সামান্য কমলেও সেই হ্রাসের গতি মোটেই আশানুরূপ নয়। পাশাপাশি বর্ষার মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ একসঙ্গে বাড়তে শুরু করায় হাসপাতালগুলির ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তিনি এবং দেশের অন্যান্য প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে কর্তৃপক্ষের কাছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ অভিযান জোরদার করা, অস্থায়ী চিকিৎসা পরিকাঠামো বা বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং ডেঙ্গু মোকাবিলায় আলাদা বিশেষ ইউনিট গড়ে তোলার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে বর্তমান পরিস্থিতি কোনোমতেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে না পারে।