বর্ষার দাপটে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গেও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস: বিপর্যস্ত জনজীবন, সতর্কতা জারি!
কলকাতা, ২৯ জুলাই, ২০২৫: কয়েকদিনের লাগাতার বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রবিবার রাত থেকে দার্জিলিং জেলায় শুরু হওয়া প্রবল বৃষ্টি সোমবারও অব্যাহত ছিল, এবং আজও, মঙ্গলবারও বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর। অন্যদিকে, দক্ষিণবঙ্গেও একটি নিম্নচাপের প্রভাবে আজ থেকে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ পরিস্থিতি
উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় কার্শিয়াংয়ে ৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টির জেরে তিস্তার জলস্তর অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কালিম্পংয়ের তিস্তাবাজার এলাকায় ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের একাংশ জলের তলায় চলে গেছে। ১৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি দার্জিলিং এবং সিকিমের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত, যা দার্জিলিং, কালিম্পং, গ্যাংটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিকে সংযুক্ত করে। জাতীয় সড়কের একাংশ ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সমস্ত যানবাহনের অভিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, বৃষ্টির কারণে দার্জিলিংয়ের হুকার রোড এবং মানেভঞ্জন-বিজনবাড়ি সড়কে ধস নেমেছে। বহু কাঁচা বাড়ি ধসে পড়েছে দার্জিলিং শহর ও সংলগ্ন এলাকায়। দার্জিলিং শহরে সোমবার রাত থেকে বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। লোয়াদীতে আজ ভোরে নতুন করে ধস নেমেছে। তিস্তা নদীর পাশাপাশি মহানন্দা এবং বালাসন নদীতেও জলস্তর বেড়েছে। স্বস্তির খবর এই যে, বর্তমানে পাহাড়ে পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এখনও পাহাড়ে পুরোদমে বর্ষা শুরু হয়নি। অগস্টের প্রথম সপ্তাহে বর্ষার প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে পরিস্থিতি আরও বেসামাল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মৌসুমি অক্ষরেখা বর্তমানে সক্রিয় থাকায় পাহাড়ে ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনকে এই বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আজ দার্জিলিংয়ের পাশাপাশি জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, কোচবিহারের মতো জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বুধবারও উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির দাপট জারি থাকবে এবং সপ্তাহান্তে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
দক্ষিণবঙ্গেও দুর্যোগের ঘনঘটা
উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গেও নিম্নচাপের জেরে প্রবল বৃষ্টির পূর্বাভাস জারি করেছে আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর। আজ ভোররাত থেকেই শহর কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চল জুড়ে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পূর্ব এবং পশ্চিম বর্ধমানের মতো জেলাগুলিতে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি চলবে। বুধবারেও বৃষ্টি জারি থাকবে বলে জানিয়েছে মৌসম ভবন।
মৌসুমি অক্ষরেখা বর্তমানে শ্রীগঙ্গানগর, ঝুনঝুনু, উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও সংলগ্ন পূর্ব রাজস্থানে অবস্থিত নিম্নচাপ কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে পন্না, ডালটনগঞ্জ, পুরুলিয়া হয়ে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্ব দিকে উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত এবং কিছু কিছু স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
আজ শহর কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৫.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ৯৮%।
আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর আরও জানিয়েছে যে, মঙ্গলবার রাজ্যের পাঁচটি জেলা ছাড়া বাকি সব জেলাতেই ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়াও বিপদ বাড়াবে। ৩০শে আগস্ট, বুধবার, উত্তরের জেলাগুলিতে বৃষ্টির দাপট কম থাকলেও দক্ষিণবঙ্গ দুর্যোগ থেকে রেহাই পাবে না।
বুধবার বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, হাওড়া, হুগলি, উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, দুই মেদিনীপুর, দুই বর্ধমান, নদিয়া এবং মুর্শিদাবাদে হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই জেলাগুলিতে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। আগামী এক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণবঙ্গের জেলায় জেলায় বৃষ্টি জারি থাকবে, যদিও বৃহস্পতিবার থেকে বৃষ্টির দাপট কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহেও কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উত্তর থেকে দক্ষিণ, উভয় বঙ্গের জনজীবনই বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে এবং সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।