“ফসিল্‌স থেকে হুলিগানিজম”-বদলে যাওয়া সময়ে বাংলা ব্যান্ড কি সত্যিই আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে যাচ্ছে?

নব্বইয়ের দশকে ক্যাসেটের ফিতা আর টেপ রেকর্ডার থেকে শুরু করে আজকের ইউটিউব বা স্পটিফাই—বাংলা ব্যান্ডের যাত্রাপথ দীর্ঘ। ক্যাকটাস, ভূমি, চন্দ্রবিন্দু কিংবা ফসিল্‌স—যাদের সুরে একসময় বুঁদ হয়ে থাকত বাঙালি, তাদের উত্তরাধিকার কি তবে এখন সংকটে? ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে বাংলা ব্যান্ড কি সত্যিই তার হারানো জৌলুস ফিরে পেতে লড়াই করছে? বাংলা ডট আজতক ডট ইন-এর অনুসন্ধানে উঠে এল এক ভিন্ন চিত্র।

জনপ্রিয়তা কি কমেছে? কী বলছেন তারকারা?

  • ফসিল্‌স ও রূপম ইসলাম: ফসিল্‌সের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি বলে দাবি রূপম ইসলামের। তিনি জানান, তাদের নতুন অ্যালবাম সারা ভারতে স্বীকৃত এবং স্পটিফাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মে বলিউড অ্যালবামকে টেক্কা দিয়ে এক নম্বর স্থান দখল করেছে। তাঁর মতে, অন্য ব্যান্ডের জনপ্রিয়তা কম কেন, তা নিয়ে তিনি অনধিকার চর্চা করতে চান না। তবে এফএম-এর গুরুত্ব বর্তমানে অত্যন্ত কমে গেছে বলে তিনি মনে করেন।

  • ক্যাকটাস ও সিধু: ক্যাকটাসের সিধুর মতে, আগের মতো পাগলামো হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু ব্যান্ডগুলি এখনও অত্যন্ত স্থিতিশীল। নতুন ব্যান্ড প্রচুর তৈরি হচ্ছে, কিন্তু প্রচারের অভাবে তারা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। সিধুর বিস্ফোরক অভিযোগ, এফএম চ্যানেলগুলোতে এক বিশেষ স্ট্র্যাটেজির কারণে ২০১০-এর পরের বাংলা নন-ফিল্ম গান সেভাবে জায়গা পাচ্ছে না। রাজনৈতিক পালাবদল এবং ফিল্ম প্রোডিউসিং হাউসের আধিপত্য বাংলা নন-ফিল্ম মিউজিককে কিছুটা কোণঠাসা করেছে বলে তিনি মনে করেন।

  • সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়: সুরজিৎ-এর মতে, বাংলা ব্যান্ড এখন কিছুটা ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ হয়ে গেছে। অ্যালগোরিদম এবং এফএম চ্যানেলের অনীহায় নতুন ব্যান্ডগুলোর মাস লেভেলে জনপ্রিয়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে তিনি মনে করেন, একটি সঠিক ড্রাইভ বা দু-তিনটি গান হিট করলেই পরিস্থিতি আবার বদলে যেতে পারে।

  • হুলিগানিজম ও দেবরাজ ভট্টাচার্য: বর্তমান সময়ের সফল ব্যান্ড ‘হুলিগানিজম’-এর দেবরাজ ভট্টাচার্যের মতে, ব্যান্ড তৈরির ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা মানুষকে ব্যক্তিগত কাজের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়তে সাহায্য করছে। তবে তিনি মনে করেন, ব্যান্ডের গান বড় হোক বা ছোট, ভালো কাজ করলে শ্রোতা তা গ্রহণ করে। তিনি দক্ষিণ ভারতের মতো পশ্চিমবঙ্গেও রেডিওতে স্থানীয় ভাষার গান বাজানো বাধ্যতামূলক করার পক্ষে মত দিয়েছেন।

কেন নতুন ব্যান্ডগুলি সেভাবে উঠে আসছে না?

বিশেষজ্ঞরা এবং ব্যান্ড সদস্যরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন:

১. সিনেমার গানের আধিপত্য: মিউজিক প্রোডিউসিং হাউসগুলো তাদের সিনেমার গানের জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ২. এফএম-এর ভূমিকা: নতুন বাংলা নন-ফিল্ম গান রেডিওতে সেভাবে বাজানো হয় না, যা গান জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। ৩. অ্যালগোরিদমের প্রভাব: মিউজিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগোরিদম পুরনো গান বা নির্দিষ্ট কিছু গানকেই বারবার শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। ৪. ব্যান্ড কালচারের পরিবর্তন: কম্পিউটারে গান তৈরির সহজলভ্য প্রযুক্তি আসায় অনেক তরুণ এককভাবে মিউজিক তৈরির দিকে ঝুঁকছেন, ফলে যৌথ ব্যান্ড গঠনের প্রবণতা কিছুটা কমছে।

উপসংহার: ২০২৬-এ বাংলা ব্যান্ডের হাল-হকিকত মিশ্র। একদিকে ফসিল্‌সের মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডের রাজত্ব, অন্যদিকে নতুনদের টিকে থাকার লড়াই। প্রযুক্তি এবং মিডিয়া ব্যবহারের নতুন সমীকরণে বাংলা ব্যান্ড যে তার হারানো জৌলুস ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় মরিয়া, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে নতুন কোনো ওয়েভ বা জোয়ার বাংলা ব্যান্ডের আঙিনায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে কি না।