প্রতি বছর বাড়ছে আকার! জঙ্গলের মাঝে কোন অলৌকিক রহস্য লুকিয়ে আছে এই শিবলিঙ্গে?

ছত্তিশগড়ের গরিয়াবন্দ জেলার মারৌদা গ্রাম। চারপাশে শুধু ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ে ঘেরা নির্জন এই প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে রয়েছে ভক্তদের পরম আস্থার জায়গা—ভূতেশ্বরনাথ মহাদেব মন্দির। স্থানীয় মানুষ অত্যন্ত ভক্তিভরে এই স্থানকে ‘ভূমিয়ার ধাম’ বা ‘বুড়া ভূতেশ্বর’ নামেও ডেকে থাকেন। বহু বছর ধরেই এটি একটি অলৌকিক ও পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত লাভ করেছে।

এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এখানে কোনো কৃত্রিম মূর্তি নেই। ঘন জঙ্গলের মধ্যে মাটি ফুঁড়ে প্রাকৃতিকভাবে বেরিয়ে এসেছে এক বিশাল শিলা। স্থানীয় ভক্তদের অবিচল বিশ্বাস, এটিই স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গ। বর্তমানে এই শিবলিঙ্গের উচ্চতা প্রায় ১৮ ফুট এবং এর পরিধি ২০ ফুটেরও বেশি। এই বিশাল আকৃতির কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ ও ভক্ত একে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক শিবলিঙ্গ হিসেবে মনে করেন।

সবচেয়ে রহস্যময় এবং অবাক করার বিষয় হলো, এই শিবলিঙ্গটি নাকি প্রতি বছর প্রায় ৬ ইঞ্চি থেকে ১ ফুট পর্যন্ত আকারে বড় হয়। মন্দিরের প্রধান পুরোহিতদের দাবি, বিগত ৩০ বছরে এর উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কীভাবে প্রতি বছর এই শিলাটি নিজে থেকেই বৃদ্ধি পায়, তার কোনো সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। সাধারণ মানুষ ও ভক্তরা একে দেবাদিদেব মহাদেবের অলৌকিক লীলা বলেই মনে করেন।

বর্ষাকালে এখানকার ভৌগোলিক দৃশ্য আরও অদ্ভুত রূপ নেয়। এলাকার নদী ও ঝরনার জলের স্তর বৃদ্ধি পেয়ে গোটা মন্দির চত্বর প্রায় ৪ থেকে ৫ ফুট জলের নিচে সম্পূর্ণ ডুবে যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দমে যান না ভক্তরা। জলের নিচে বুকসমান স্তরে দাঁড়িয়েই তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে ভোলানাথের পুজো করেন। জল নেমে গেলে নিয়মমাফিক সাধারণ পুজো আবার শুরু হয়। অনেক ভক্তের দাবি, এই নিমজ্জিত অবস্থার মধ্যেও নাকি বাবার দিব্য জ্যোতি স্পষ্ট দেখা যায়।

এই শিবলিঙ্গকে অলৌকিক ও পবিত্র মানার পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি সম্পূর্ণ স্বয়ম্ভু। কথিত আছে, প্রায় ৩০০ বছর আগে এক স্থানীয় কৃষক জঙ্গলে গরু চরাতে এসে লক্ষ্য করেন যে তাঁর একটি বিশেষ গরু প্রতিদিন এই নির্দিষ্ট জায়গায় এসে নিজের থেকেই দুধ ঢেলে চলে যায়। পরে ওই স্থানটি খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে এই বিশাল রহস্যময় শিলা। দ্বিতীয়ত, এখানে আন্তরিকভাবে মানত করলে মানুষের সমস্ত মনোকামনা পূরণ হয় বলে বিশ্বাস রয়েছে। বিশেষ করে জমি-জায়গা সংক্রান্ত জটিলতা এবং সন্তান লাভের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ এখানে ছুটে আসেন। তৃতীয়ত, পবিত্র শ্রাবণ মাসে এখানে লক্ষাধিক ভক্তের বিশাল সমাগম ঘটে এবং মহাশিবরাত্রিতে ৩ দিনব্যাপী এক বিরাট মেলা বসে। সেই সময় বহু নাগাসাধুর সমাগম এই স্থানটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

যাঁরা এই অলৌকিক মন্দির দর্শনে যেতে চান, তাঁদের জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা খুব একটা জটিল নয়। ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে গরিয়াবন্দ শহর অবস্থিত। সেখান থেকে মারৌদা গ্রামের দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার। তবে শেষ ১ কিলোমিটার পথ সম্পূর্ণ ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁটে পার হতে হয়। যাতায়াতের রাস্তা কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও মহাদেবের দর্শন পাওয়ার পর ভক্তদের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষে দূর হয়ে যায়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভূতেশ্বরনাথ মহাদেব মন্দির কেবল একটি সাধারণ উপাসনালয় নয়, এটি প্রকৃতি ও শিবের এক অনন্য মিলনের ক্ষেত্র। ঘন জঙ্গল, বিশালকায় শিবলিঙ্গ এবং ভক্তদের অটুট ভক্তি—সব মিলিয়ে এই জায়গার আবহাওয়া সত্যিই অলৌকিক। প্রতি বছর নিয়ম করে বেড়ে চলা এই শিবলিঙ্গই প্রমাণ করে যে দেবাদিদেব মহাদেব আজও এই ধরাধামে জাগ্রত রয়েছেন।