প্রকৃত উপভোক্তাদের নাম বাদ দিচ্ছে পুরনো আমলারা? জট কাটাতে আসরে নামলেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল

পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) সরকার ক্ষমতায় এসেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছিল যে, অতীতে যাঁরা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের সুবিধা পেতেন, তাঁদের প্রত্যেকেই নতুন ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আর্থিক অনুদান পাবেন। সেই সময় এই কথা স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক তদন্তে দেখা যায় যে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকদের পূর্ববর্তী তালিকায় বিস্তর অনিয়ম ও গড়মিল রয়েছে। জেলায় জেলায় খতিয়ে দেখে বহু ভুয়ো নাম এমনকি বহু পুরুষ-প্রাপকের নামও সেই তালিকা থেকে উদ্ধার হয়। তখনই সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, প্রকল্পের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রত্যেক উপভোক্তাকে নতুন করে নতুন ফরম ফিলাপ করতে হবে এবং নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করার পরেই সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা হস্তান্তর করা হবে।

কিন্তু এই নতুন নিয়মের কড়াকড়ির ফলে বহু প্রকৃত যোগ্য মহিলা এখনও অন্নপূর্ণা যোজনার মাসিক টাকা হাতে পাননি বলে অভিযোগ তুলেছেন। যদিও গত জুন ও জুলাই মাসে দুই দফায় রাজ্যের বহু মহিলাই অন্নপূর্ণা যোজনার বকেয়া টাকা হাতে পেয়ে গিয়েছেন, তবুও যাঁরা এখনও পর্যন্ত এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন, তাঁদের সমস্যা সমাধানে এবার আসরে নেমে পড়েছে বিজেপি সরকার। বঞ্চনার এই জট কাটাতে কী ভাবছে রাজ্য সরকার, তা খোদ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন রাজ্যের নগরোন্নয়ন ও পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।

তিনি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান যে, অন্নপূর্ণা যোজনার আর্থিক সুবিধা যেন দেশের বা রাজ্যের কোনো ভুয়ো বা অন্যায্য ব্যক্তির পকেটে না গিয়ে একমাত্র প্রকৃত ও অসহায় উপভোক্তাদের কাছেই সঠিকভাবে পৌঁছায়, সেই মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এবার ভারতীয় জনতা পার্টি মহিলা মোর্চার পক্ষ থেকে একটি সম্পূর্ণ নতুন জনমুখী কর্মসূচি শুরু হতে চলেছে—যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বৈঠকে আড্ডা’। এই কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে গিয়ে নগরোন্নয়ন ও পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, “আমাদের রাজ্য সরকার একেবারে শুরু থেকেই চেয়েছিল, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত প্রকৃত উপভোক্তাই যেন অন্নপূর্ণা প্রকল্পের সুফল পান। সেই সময় আমি মন্ত্রী ছিলাম, আমিও এ কথা জোরালোভাবে বলেছিলাম, আমাদের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীও একই কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে খতিয়ে দেখা যায় যে, যাঁরা এতদিন ধরে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পেয়ে আসছিলেন, তাঁদের মধ্যে এমন অনেক নাম রয়েছে যাঁদের এই সুবিধা পাওয়ার কোনো কথাই ছিল না।”

অগ্নিমিত্রা পাল আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করে বলেন, “আমরা প্রথম দিন থেকেই পরিষ্কার বলেছিলাম যে, আমরা চাই যাঁরা এতদিন ধরে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পেয়ে এসেছেন, তাঁরা সবাই যেন অন্নপূর্ণা প্রকল্পের টাকা পান। কিন্তু পরে দেখা গেল যে, যাঁরা সেই সুবিধা এতদিন পেয়ে এসেছেন, তাঁদের অনেকেই আসলে পুরুষ! আবার এমন অনেক মহিলাও রয়েছেন যাঁদের এই অনুদান পাওয়ার কথাই নয়, কারণ তাঁরা প্রত্যেকেই নিয়মিত ইনকাম ট্যাক্স বা আয়কর প্রদান করেন। সুতরাং, এই সমস্ত অসঙ্গতি ধরা পড়ার পরেই আমরা কিছু নিয়মে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু এখন আমরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে প্রধান সমস্যাটি বারবার শুনছি, তা হলো—যাঁদের সত্যিই এই সাহায্য পাওয়ার কথা এবং যাঁরা সম্পূর্ণ যোগ্য, তাঁরা নানা কারণে এখনও সেই টাকা পাচ্ছিলেন না।”

মন্ত্রীর আরও গুরুতর অভিযোগ, “প্রশাসনের নিচুতলায় বা বিভিন্ন স্তরে এখনও এমন কিছু ব্যক্তি বহাল তবিয়তে রয়েছেন, যাঁরা আগের সরকারের তোষামোদি করেই এখনও সবকিছু চালাচ্ছেন এবং জেনুইন বা প্রকৃত উপভোক্তাদের নামগুলো ইচ্ছা করে তালিকাভুক্ত বা আপলোড করছেন না। এই সমস্যার কথা যখন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর গোচরে এল, তখন তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছেন যে, যদি সেরকম কোনো নির্দিষ্ট বা স্পেসিফিক অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে থাকে, তবে আপনারা লিখিতভাবে তা জানান—সঙ্গে সঙ্গে যাচাই করে তাঁদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে।”

তবে বর্তমানে এই প্রক্রিয়ার জেরে আরেকটি বড় সমস্যা জনসমক্ষে এসেছে। অনেক প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তি, যাঁদের এই অনুদান পাওয়ার সমস্ত আইনি অধিকার রয়েছে, তাঁরাও এখনও অন্নপূর্ণা প্রকল্পের আওতায় নিজেদের নাম নথিভুক্ত করাতে পারেননি। অভিযোগ উঠেছে যে, প্রশাসনের কিছু স্তরের অসৎ আধিকারিক বা কর্মীরা এখনও প্রকৃত উপভোক্তাদের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে তালিকাভুক্ত বা পোর্টালে আপলোড করা থেকে বিরত থাকছেন। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যখন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আনা হয়েছে, তখন তিনি অত্যন্ত কড়া ও স্পষ্ট নির্দেশ জারি করে বলেছেন—যদি এমন কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ বা বঞ্চনার কথা কারো জানা থাকে, তবে তা যেন সরাসরি লিখিতভাবে প্রশাসনকে জানানো হয়। এরপর প্রাপ্ত সমস্ত অভিযোগ দ্রুত ও কঠোরভাবে যাচাই করে রাজ্যের প্রতিটি প্রকৃত ও যোগ্য ব্যক্তিকে অন্নপূর্ণা প্রকল্পের সুযোগ ও আর্থিক সুবিধা সুরক্ষিত করা হবে।