পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষে অমানবিক দৃশ্য! কাদাজল ঠেলে ‘শ্মশান যাত্রা’, মৃতদেহ নিয়ে দুর্ভোগ চরমে

যখন উন্নয়ন ও স্মার্ট সিটির স্লোগান বাতাসে ভাসে, তখন পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা সেই সব দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। হাঁটু সমান কাদাজল আর পিচ্ছিল পথ ঠেলে শ্মশানে মৃতদেহ সৎকার করতে যাওয়ার এক মর্মান্তিক ছবি সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, যা সমাজের এক অমানবিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। অভিযোগ, গ্রামের বেহাল রাস্তার কারণেই এক ব্যক্তির মৃত্যুর একদিন পরেও তার সৎকার করা সম্ভব হয়নি, যা গ্রামবাসীদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
৮০০ মিটার রাস্তা, এক গভীর যন্ত্রণা:
ঘটনাটি ঘটেছে খণ্ডঘোষের গোপালবেড়া পঞ্চায়েতের ইন্দুটি গ্রামে। গ্রাম থেকে শ্মশান পর্যন্ত মাত্র ৮০০ মিটারের একটি রাস্তা দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল দশায় পড়ে রয়েছে। বর্ষার সময় এই রাস্তার দশা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে, যেখানে হাঁটু পর্যন্ত কাদাজল জমে যায়, পিচ্ছিল হয়ে ওঠে হাঁটার পথ। এই বেহাল রাস্তার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে, এবং এই দুর্ভোগের সর্বশেষ শিকার হলেন একজন মৃত ব্যক্তি ও তার আত্মীয়-স্বজন।
অভিযোগ উঠেছে যে, গত শনিবার ইন্দুটি গ্রামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হলেও, রাস্তার এই শোচনীয় অবস্থার কারণে তার মৃতদেহ সেদিন শ্মশানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অগত্যা, তাকে রবিবার সকালে, কাদাজল ঠেলে নিয়ে যাওয়া হয় সৎকারের জন্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলিতে দেখা যাচ্ছে, শোকাহত আত্মীয়রা কিভাবে কাদাজলের মধ্যে দিয়ে মৃতদেহ বহন করছেন, যা প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
রাজনৈতিক চাপানউতোর: ‘কাটমানি’ বনাম ‘কসমেটিক উন্নয়ন’
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র তরজা। বিজেপির পক্ষ থেকে সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। বিজেপির অভিযোগ, “তৃণমূল সরকার কাটমানি তুলতে ব্যস্ত, তাই রাজ্যজুড়েই উন্নয়ন বেহাল।” তারা দাবি করছেন, এই ঘটনা তৃণমূলের প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।
অন্যদিকে, সিপিএম এই ঘটনাকে “কসমেটিক উন্নয়নের নমুনা” বলে কটাক্ষ করেছে। তাদের মতে, সরকার কেবল বাহ্যিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, কিন্তু গ্রামীণ এলাকার মৌলিক সমস্যাগুলি উপেক্ষিত হচ্ছে।
এই সমস্ত অভিযোগের জবাবে জেলা পরিষদ জানিয়েছে যে, তারা দ্রুত রাস্তা মেরামতির কাজ শুরু করবে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা হবে।
মানবতার প্রশ্ন:
তবে, রাজনৈতিক বাগবিতণ্ডার ঊর্ধ্বে উঠে এই ঘটনাটি বৃহত্তর একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছে: একটি সভ্য সমাজে, যেখানে উন্নয়নের দাবি করা হয়, সেখানে মৃত্যুর পর শেষকৃত্যের মতো একটি মৌলিক অধিকার পালনেও কেন এমন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে? ইন্দুটি গ্রামের এই চিত্র কেবল একটি রাস্তার বেহাল দশার গল্প নয়, এটি গ্রামীণ অবকাঠামোর সামগ্রিক দুর্দশা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি প্রশাসনিক উদাসীনতার এক জীবন্ত প্রমাণ। এই ছবিগুলি শুধুই ভাইরাল হওয়া উচিত নয়, বরং প্রশাসনের বিবেককে নাড়া দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।