পুরোনো গাড়ি কি অচল হয়ে যাবে? ইথানল ব্লেন্ডিং নিয়ে কেন্দ্র যা স্পষ্ট করল জানলে চোখ কপালে উঠবে!

দেশজুড়ে ই২০ পেট্রোল ব্যবহারকে কেন্দ্র করে চলমান তীব্র জল্পনা ও নানা মহলের উদ্বেগের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান স্পষ্ট করল কেন্দ্রীয় সরকার। পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমানে দেশে প্রচলিত ই২০ পেট্রোলের কারণে সাধারণ মানুষের কোনো গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আজ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। সোমবার সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় এক লিখিত জবাবে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী সুরেশ গোপী অত্যন্ত জোরালোভাবে পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান যে, আজ গোটা ভারতজুড়ে ২৩ কোটিরও বেশি যানবাহন অত্যন্ত নির্বিঘ্নে ই২০ পেট্রোল ব্যবহার করছে। এই বিশাল সংখ্যক যানবাহনের মধ্যে রয়েছে ২০ কোটিরও বেশি দুই-চাকার যান এবং ৩ কোটিরও বেশি পেট্রোল চালিত চার চাকার গাড়ি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিপুল গাড়িবহুরের মধ্যে এমন বহু পুরনো মডেলের যানবাহনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেগুলি আদতে ই২০ পেট্রোলের ব্যবহারের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রত্যয়িত ছিল না। তা সত্ত্বেও দেশজুড়ে চলা এই লক্ষ লক্ষ পুরোনো ও নতুন গাড়িগুলিতে ই২০ জ্বালানি ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিন সিজ হওয়া বা গাড়ি মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো কোনো বড় যান্ত্রিক ত্রুটির খবর এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে সামনে আসেনি।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে জানানো হয়েছে যে, ভারতে হুট করে এক ধাক্কায় এই ই২০ ফুয়েল চালু করা হয়নি। বরং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বেশ কয়েক বছর ধরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যেখানে ২০১৩-১৪ সালের অর্থবর্ষে পেট্রোলে ইথানলের মিশ্রণের মাত্রা নামমাত্র ১.৫৩ শতাংশ ছিল, সেখানে দফায় দফায় কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বহুমুখী পরামর্শ ও পর্যালোচনার পরই ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। প্রতিটি ধাপে পেট্রোলে ইথানল মেশানোর আগে নীতি আয়োগ, অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া বা এআরএআই (ARAI), সিয়াম (SIAM), ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পেট্রোলিয়াম (IIP), দেশের শীর্ষস্থানীয় তৈল বিপণন কোম্পানি এবং নামী যানবাহন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির যৌথ উদ্যোগে ব্যাপক ল্যাব টেস্ট, কঠোর অন-রোড ড্রাইভ টেস্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি পারফরম্যান্স মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়েছে। এই সমস্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষায় ইঞ্জিনের হর্সপাওয়ার, ফুয়েল সিস্টেমের সামগ্রিক কার্যকারিতা, অভ্যন্তরীণ ক্ষয় প্রবণতা, মাইলেজের হেরফের, ক্ষতিকারক নিষ্কাশন গ্যাস এবং সার্বিক ইঞ্জিন পারফরম্যান্স অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে।
গাড়ির মাইলেজ এবং টেকসই যান্ত্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে দীর্ঘদিনের আশঙ্কা ছিল, তাও এদিন পরিষ্কার করে দিয়েছে সরকার। দেশের শীর্ষস্থানীয় গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির দেওয়া অফিশিয়াল তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে মন্ত্রক জানিয়েছে যে, একা একটি প্রধান অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক কোম্পানি বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রায় ২.৮৪ কোটি গাড়ির সার্ভিসিং সম্পন্ন করেছে, যার মধ্যে প্রায় ১.৫ কোটিই ছিল বহু পুরোনো মডেলের গাড়ি। ওই সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ই২০ পেট্রোল ব্যবহারের কারণে গ্রাহকদের গাড়ির কোনো বড় বা স্থায়ী ক্ষতির ঘটনা নিশ্চিত করা যায়নি। একইভাবে, দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দু-চাকার যান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানও নিশ্চিত করেছে যে, পুরনো ইঞ্জিনের মডেলগুলির তুলনায় ই২০ জ্বালানি ব্যবহৃত নতুন বা পুরোনো যানবাহনে অতিরিক্ত কোনো গুরুতর যান্ত্রিক ত্রুটি নজরে আসেনি। তবে সরকার অত্যন্ত সততার সঙ্গে স্বীকার করেছে যে, বিশেষ করে যে সমস্ত পুরোনো গাড়ি কেবল ই১০ বা দশ শতাংশ ইথানলযুক্ত পেট্রোলের কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা হয়েছিল, সেগুলিতে সামান্য ৩ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত মাইলেজ হ্রাসের প্রবণতা দেখা যেতে পারে। তা সত্ত্বেও সরকারের জোরালো দাবি, প্রচলিত সাধারণ জ্বালানির তুলনায় ই২০ পেট্রোলের অকটেন রেটিং অনেক বেশি উন্নত, যা ইঞ্জিনের ক্ষতিকর নকিং বা ধাতব শব্দ সম্পূর্ণ দূর করে, জ্বালানিকে আরও পরিষ্কারভাবে দহন করতে সাহায্য করে এবং গাড়িকে দীর্ঘপথে আগের চেয়ে অনেক বেশি মসৃণ গতি প্রদান করে।
ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতি এবং পেট্রোল পাম্পগুলিতে আলাদাভাবে জ্বালানি বিক্রির সম্ভাবনা নিয়ে চলা জল্পনাও সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে কেন্দ্র। সরকারের পক্ষ থেকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এই মুহূর্তে প্রচলিত ই২০ সীমার বাইরে গিয়ে ভবিষ্যতে ই৩০ বা তার চেয়েও বেশি মাত্রায় ইথানল মিশ্রণের বিষয়ে নীতিনির্ধারক স্তরে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে যদি কখনো ই৩০ মিশ্রণের মতো বড় নীতিগত পদক্ষেপ বিবেচনা করাও হয়, তবে তার আগে ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কঠোর প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং দেশের সমস্ত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিস্তারিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি, দেশবাসীর একাংশের দাবি উড়িয়ে দিয়ে সরকার জানিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমানে দেশের কোনো পেট্রোল পাম্পেই আলাদাভাবে ইথানল-মুক্ত কিংবা নামমাত্র ইথানলযুক্ত পেট্রোল আলাদাভাবে বা পৃথক মূল্যে বিক্রির কোনো রূপরেখা বা পরিকল্পনা প্রশাসনের টেবিলে নেই। দেশের বায়ুমণ্ডলের দূষণ রোধ এবং সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের একমাত্র প্রধান লক্ষ্য।