পুরুষতন্ত্রের খাঁচায় জাপানি রাজতন্ত্র! উত্তরাধিকারী তৈরিতে অদ্ভুত আইন সংশোধন করল সংসদ, ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ

জাপানের রাজপরিবারে পুরুষতন্ত্রের আধিপত্য বজায় রাখতে ১৯ শতকের ঐতিহাসিক ‘ইম্পেরিয়াল হাউস ল’ বা রাজকীয় আইন সংশোধন করল জাপানের সংসদ। শুক্রবার পাস হওয়া এই ঐতিহাসিক সংশোধনীতে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে কেবলমাত্র পুরুষদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন রাজপরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নারীদের সিংহাসনে বসার অধিকার কেড়ে নেওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা দেশ।

নতুন এই আইন অনুযায়ী, রাজপরিবারের কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকলে দূর সম্পর্কের কোনো পুরুষ আত্মীয়কে দত্তক নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, রাজকন্যারা সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলেও তাঁদের রাজকীয় মর্যাদা বজায় রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংশোধনীতে নারীদের সিংহাসনে বসার অধিকার থেকে বঞ্চিত করায় রাজতন্ত্র বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।

জাপানি রাজপরিবারের সদস্য সংখ্যা ক্রমাগত কমছে এবং বর্তমান সদস্যরা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায়, বর্তমান সম্রাট নারুহিতোর ২৪ বছর বয়সী কন্যা আইকো সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। জাপানজুড়ে অধিকাংশ মানুষই আইকোকে পরবর্তী সম্রাট হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু নতুন আইনে আইকোকে অযোগ্য গণ্য করায় নারীদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। বিশিষ্ট নারীবাদী গবেষক চিজুকো উয়েনোর মতে, এই নতুন পদক্ষেপ রাজপরিবারের নারীদের কেবল সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করবে।

বর্তমানে রাজপরিবারে পুরুষের সংখ্যা মাত্র ৫ জন। সম্রাট নারুহিতোর পরবর্তী উত্তরাধিকারী তাঁর ভাই, এরপর প্রিন্স হিসাহিতো এবং তারপর সম্রাটের কাকা। পুত্রসন্তানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ায় গত চার দশকে হিসাহিতোই একমাত্র পুরুষ উত্তরাধিকারী। সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার যে দত্তক প্রথা চালু করেছে, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। সমালোচকদের মতে, যাঁদের মানুষ চেনে না, তাঁদের রাজসিংহাসনে বসানোর চেয়ে রাজকন্যা আইকো অনেক বেশি যোগ্য। এমনকি যারা অতীতে রাজ মর্যাদা ত্যাগ করেছেন, তারাও রাজপ্রাসাদের এই নতুন প্রস্তাবকে নিষ্ঠুর বলে অভিহিত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দাবি করেছেন, “পুরুষ রক্তধারাই কর্তৃত্ব ও বৈধতার একমাত্র উৎস।” কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক মোহ জাপানের দেড় হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদরা। ১৯৪৫ সালের পর থেকে জাপানে রাজপরিবারের নারীদের ওপর যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, তা রাজকুমারী আইকোর মা সম্রাজ্ঞী মাসাকোর অবসাদের মধ্যে দিয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধুনিক যুগে এই কঠোর পিতৃতান্ত্রিক নিয়ম অচল। সিংহাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই হঠকারী সিদ্ধান্ত জাপানি রাজতন্ত্রকে চরম অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।