পা অবশ হওয়া কিংবা ছোট্ট ক্ষতও হতে পারে সর্বনাশা! ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের পায়ের যত্ন না নিলে কী পরিণতি হতে পারে?

ডায়াবেটিস এমন একটি নিঃশব্দ ও মারাত্মক রোগ, যা কেবল রক্তে শর্করার মাত্রাই বাড়িয়ে তোলে না, বরং ধীরে ধীরে শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের অপূরণীয় ক্ষতি করে। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের সবচেয়ে বেশি এবং মারাত্মক প্রভাব পড়ে চোখ, কিডনি, হৃদযন্ত্র এবং পায়ের ওপর। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পায়ের যত্নে সামান্যতম অবহেলাও ডেকে আনতে পারে এক বিশাল বিপদ।

চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে রক্তে সুগার বা শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীরের স্নায়ু (Nerves) এবং রক্তনালিগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে পায়ে কোনো ধরনের সমস্যা বা আঘাত লাগলেও অনেক সময় রোগীরা তা টের পান না।

পায়ে স্নায়ুক্ষতির সাধারণ ও প্রাথমিক লক্ষণসমূহ:

পায়ে অস্বাভাবিক ঝিনঝিনি ধরা, পা অবশ হয়ে যাওয়া কিংবা তীব্র জ্বালাপোড়া করা।

অনেকের ক্ষেত্রে মনে হয় পায়ে যেন সূচ ফোটার মতো অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে।

অনুভূতিশক্তি হ্রাস পাওয়ার কারণে কোথাও কেটে গেলে, ফোসকা পড়লে বা পায়ে কাঁটা ফুটলেও তা সময়মতো বুঝতে পারা যায় না। আর পরবর্তীকালে সেই অবহেলা করা সামান্য ক্ষত থেকেই শরীরে ভয়াবহ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পাশাপাশি, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের পায়ের ত্বক খুব দ্রুত স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারিয়ে অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়ে। অনেকেরই গোড়ালি ফেটে যায় বা চামড়া উঠতে শুরু করে। এই ফাটা দেওয়াল বা ফাটলগুলির মাধ্যমেই সহজে ক্ষতিকারক জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তাই পায়ের ত্বক সর্বদা পরিষ্কার ও আর্দ্র বা ময়েশ্চারাইজড রাখা অত্যন্ত জরুরি।

পায়ে যদি কখনো ছোটখাটো কোনো ঘা বা ক্ষত তৈরি হয় এবং তা যদি সাধারণ চিকিৎসায় কয়েকদিনের মধ্যেও না শুকায়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কারণ ডায়াবেটিসের কারণে রক্ত চলাচল বা ব্লাড সার্কুলেশন কমে যাওয়ার ফলে যেকোনো ক্ষত সারতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় নেয়। সময়মতো চিকিৎসা না করা হলে সেই ছোট্ট ক্ষতটিই বড় আকার ধারণ করে বিপজ্জনক আলসার (Ulcer) বা গ্যাংগ্রিনের রূপ নিতে পারে।

যে লক্ষণগুলি দেখা দিলে অবিলম্বে সতর্ক হতে হবে:

পা অস্বাভাবিক লাল হয়ে যাওয়া বা ফুলে যাওয়া।

পায়ে অতিরিক্ত ব্যথা অনুভব হওয়া বা দুর্গন্ধ বের হওয়া।

ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হওয়া কিংবা ত্বকের রং কালচে বা নীলচে হয়ে যাওয়া।
এই সমস্ত লক্ষণগুলি অত্যন্ত গুরুতর সতর্কবার্তা। এগুলি দেখা মাত্রই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন। সামান্য দেরি হলে সংক্রমণ এতটাই ভয়াবহ রূপ নিতে পারে যে শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার বা অত্যন্ত বিরল ও দুর্ভাগ্যজনক ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগীর পায়ের কোনো অংশ কেটে বাদ দিতেও হতে পারে।

পা সুস্থ রাখতে বিশেষজ্ঞদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
১. ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রতিটি মানুষেরই প্রতিদিন নিজের পা খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত। প্রয়োজনে আয়নার সাহায্য নিন কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের সাহায্য নিয়ে পায়ের তলা ভালো করে দেখুন। কোথাও ছোট কাটা দাগ, ফোসকা, ফোলাভাব বা রঙের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা নিয়মিত খেয়াল রাখুন।
২. প্রতিদিন হালকা গরম জল দিয়ে পা ভালো করে ধুয়ে নিন এবং নরম তোয়ালে দিয়ে সম্পূর্ণ শুকনো করুন। এরপর ময়েশ্চারাইজার লাগাতে পারেন, তবে খেয়াল রাখবেন তা যেন ভুলেও পায়ের আঙুলের ফাঁকে না জমে।
৩. ঘরের ভেতরে বা বাইরে কোনো অবস্থাতেই কখনোই খালি পায়ে হাঁটবেন না। সর্বদা নরম, আরামদায়ক এবং সঠিক মাপের জুতো পরুন এবং পরিষ্কার সুতির মোজা ব্যবহার করুন।
৪. নিয়মিত নখ কাটুন, তবে খুব বেশি ছোট করে বা ধারাল কোণ কেটে ফেলবেন না, যাতে নখের কোণে আঘাত না লাগে।

সর্বোপরি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্তে শর্করার মাত্রা কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা। নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শমতো ওষুধ খাওয়া, সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, হালকা শরীরচর্চা করা এবং জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা বজায় রাখলে ডায়াবেটিসজনিত পায়ের গুরুতর সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে ফেলা সম্ভব। মনে রাখবেন, ডায়াবেটিসে পায়ের ছোট্ট কোনো সমস্যাকেও কখনোই হালকাভাবে নেবেন না। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা এবং নিয়মিত সতর্কতা ও যত্নই আপনার পা সুস্থ রাখতে এবং বড় ধরনের জটিলতা এড়াতে সবচেয়ে কার্যকর ও নিশ্চিত উপায়।