পার্সোনাল লোন পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে রাজ্যের বহু সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করা এক অভিনব প্রতারণা চক্রের মূল অভিযুক্ত সৌমিক ভট্টাচার্যকে হুগলি জেলার কোন্নগর থেকে গ্রেপ্তার করেছে বিধাননগর থানার পুলিশ। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত নথি সংগ্রহ করে তার অপব্যবহারের মাধ্যমে এই বিশাল প্রতারণা চালানো হচ্ছিল বলে জানা গেছে।
প্রতারণার অভিনব কৌশল: ফোন তুলে বিক্রি, কিস্তি গ্রাহকের ঘাড়ে
প্রতারকরা গ্রাহকদের থেকে তাদের ব্যক্তিগত নথি, যেমন – আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ইত্যাদি সংগ্রহ করত। এরপর সেই নথি ব্যবহার করে বিভিন্ন আর্থিক সংস্থা থেকে দামি মোবাইল ফোন কেনার জন্য ঋণ (লোন) তুলত। কিন্তু গ্রাহকদের হাতে সেই ফোন না দিয়ে, সেগুলো খোলা বাজারে বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকা আত্মসাৎ করত। এদিকে, গ্রাহকরা ফোনও পেতেন না, অথচ তাদের নামে তোলা ঋণের মাসিক কিস্তি (EMI) কাটা শুরু হয়ে যেত। এভাবে প্রতারিত হওয়ার পর যখন ভুক্তভোগীরা বিষয়টি বুঝতে পারতেন, তখন তাদের উপায়ন্তর না দেখে থানার দ্বারস্থ হতে হতো।
জানা গেছে, সৌমিক ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রতারণা চক্র চালাচ্ছিল। তার শিকার হয়েছেন হুগলি, হাওড়া, বিধাননগর, কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য মানুষ।
ভুক্তভোগীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
হুগলি জেলার কানাইপুর এলাকার বাসিন্দা অরূপ দে জানান, তিনিও এই প্রতারণার শিকার। তার নামে ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা দামের একটি ফোন কেনা হয়েছে। অরূপ বলেন, “এই সৌমিক পার্সোনাল লোন করিয়ে দেওয়ার নাম করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর একদিন লোন করানো হবে বলে অফিসে নিয়ে যাওয়ার নাম করে ডানকুনি এলাকার একটি ফোনের দোকানে নিয়ে যান।”
সেখানে অরূপকে বোঝানো হয়, প্রথমে তার ডকুমেন্টস দিয়ে একটা যে কোনও জিনিস নেওয়া হবে, কিন্তু তার জন্য কোনও টাকা কাটা হবে না। এই বলে অরূপের নামে একটি দামি ফোন কেনেন সৌমিক। এরপর অরূপকে বলা হয়, কিছুদিনের মধ্যেই লোনের টাকা পেয়ে যাবেন। কিন্তু কিছুদিন বাদেই ফোনের EMI কাটার মেসেজ আসতেই তার মাথায় হাত পড়ে। অরূপ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “আমি না ফোন পেয়েছি, না লোনের টাকা পেয়েছি। কিন্তু আমাকে এখন EMI দিতে হচ্ছে। আমাদের মতো বহু মানুষের সঙ্গে এ ভাবে প্রতারণা করা হয়েছে। দোষীর কঠিন সাজা হওয়া দরকার। আর EMI কোম্পানি আমাদের টাকা কাটা বন্ধ করুক।”
একইরকম ভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন কোন্নগরের আরেক বাসিন্দা মৌমিতা সিং। তিনি জানান, “আমাদের পার্সোনাল লোন করিয়ে দেওয়ার নাম করে সৌমিক আমাদের পরিবারের – আমার, আমার স্বামীর ও আমার মায়ের নামে প্রায় চার লক্ষ টাকার ফোন কিনে নেন আমাদের ডকুমেন্টস ব্যবহার করে।” মৌমিতা বলেন, সৌমিক তাকে বোঝায়, তার একার নামে বেশি লোন হবে না, তাই পরিবারের সকলের নামে ভাগ করে দেওয়া হবে। এরপর তাকে কলকাতায় একটি বড় ফোনের শোরুমে নিয়ে গিয়ে তার হাতে একটি দামি ফোন ধরিয়ে ছবি তুলে নেওয়া হয়। তারপর তাকে বাড়ি চলে যেতে বলা হয় এবং জানানো হয় কিছু সময় পরেই লোনের টাকা পেয়ে যাবেন। মৌমিতা যখন পাল্টা প্রশ্ন করেন, তখন প্রতারক তাকে বোঝায়, ফোনের দরকার না থাকলেও এটা প্রথমে করতে হয়, কিন্তু এর টাকা কাটা হবে না। যখন লোন হবে, শুধু লোনের টাকাই দিতে হবে। কিন্তু কিছুদিন পরেই ওই মহিলার কাছে EMI এর মেসেজ আসে। উল্লেখ্য, মৌমিতা সিংয়ের পরিবারের সঙ্গেই প্রায় চার লক্ষ টাকা প্রতারণা করা হয়েছে।
পুরপ্রধানের কড়া বার্তা ও পুলিশের তৎপরতা
এই বিষয়ে কোন্নগর পুরসভার পুরপ্রধান স্বপন দাস বলেন, “ছেলেটি আগে নবগ্রাম এলাকায় থাকতো। কিছু বছর হলো এদিকে ফ্ল্যাট কিনে এসেছে। আগেও এর বিরুদ্ধে এসব কথা শোনা যেত। এরা প্রত্যেকেই খুবই উচ্চাকাঙ্খী। হাই-ফাই লাইফস্টাইল ছিল এদের। সৎ পথে নিশ্চয়ই এভাবে জীবন যাপন সম্ভব নয়। তাই আবার প্রতারণা করে মানুষকে বিপদে ফেলছে। এদের কঠিন সাজা হওয়া দরকার। নাহলে এরা পরে আবার এসব কাজ চালিয়ে যাবে।”
বিধাননগর সিটি পুলিশের ইলেকট্রনিক্স কমপ্লেক্স থানায় শুক্লা পরেল নামে একজন একই ধরনের অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। এরপরই অভিযুক্ত সৌমিক ভট্টাচার্যকে হাওড়ার দাসনগর থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত আরও কেউ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে। এই গ্রেপ্তারি প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের বড় সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে, এই ধরনের প্রতারণা থেকে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছে পুলিশ।