পরীক্ষার আগে সব ভুলে যায় সন্তান? ফেলুদার মতো তুখোড় বুদ্ধি বাড়াতে প্লেটেই রাখুন এই ৫ সুপারফুড!

পরীক্ষার আগের দিন পড়তে বসলে কি সব গুলিয়ে ফেলছে সন্তান? মুখস্থ করা পড়া কি পরীক্ষার খাতায় গিয়ে নিমেষে মুছে যাচ্ছে? যদি আপনার সন্তানের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে থাকে, তবে আর মোটেও চিন্তা করবেন না। এর জন্য কোনো ওষুধ বা টোটকার প্রয়োজন নেই, আসল সমাধান লুকিয়ে রয়েছে আপনারই রান্নাঘরের ডাইনিং টেবিলে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুর মস্তিষ্কের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ বিকাশ সম্পন্ন হয়ে যায় মাত্র পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই। আর এই দ্রুত বর্ধমান কমবয়সী ব্রেনের সঠিক জ্বালানি বা পুষ্টি জোগাতে অত্যন্ত জরুরি হলো বিশেষ কিছু পুষ্টিকর খাবার। রোজের পাতে নিয়ম করে যদি এই পাঁচটি সুপারফুড রাখা যায়, তবে আপনার সন্তানের বুদ্ধি হবে একদম ফেলুদার মতো প্রখর ও ধারালো।
১. বাদাম আর কাজু—ব্রেনের নিজস্ব পেট্রোল:
পুষ্টিবিদদের মতে, বাদামকে বরাবরই ‘ব্রেন ফুড’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে আখরোটের শারীরিক গঠন অবিকল আমাদের মানব মস্তিষ্কের মতো। এর মধ্যে ভরপুর পরিমাণে রয়েছে ভিটামিন ‘ই’, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই উপাদানগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্রেনের কোষগুলোকে যেকোনো ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং পড়ায় মনোযোগ বহুলাংশে বাড়িয়ে তোলে। প্রতিদিন সকালে সন্তানকে ঘুম থেকে তুলে ৪ থেকে ৫টি ভেজানো বাদাম এবং দুটি আখরোট দুধের সঙ্গে খেতে দিন। এছাড়া স্কুলের টিফিনের বক্সেও পুষ্টিকর বাদামের লাড্ডু প্যাক করে দিতে পারেন।
২. ডিম—প্রোটিনের সত্যিকারের পাওয়ার হাউস:
প্রতিদিনের নাস্তায় ডিম রাখা কেন এতটা জরুরি? ডিমের কুসুমের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে ‘কোলিন’ নামক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এই কোলিন সরাসরি মানুষের স্মৃতিশক্তি এবং নতুন কিছু শেখার ক্ষমতাকে দ্রুত বিকশিত করে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে সমস্ত শিশুরা নিয়মিত প্রতিদিন নিয়ম করে একটি করে ডিম খায়, তাদের পড়া মনে রাখার ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। তাই সকালের ব্রেকফাস্টে একটি সেদ্ধ ডিম কিংবা সুস্বাদু অমলেট বাধ্যতামূলকভাবে রাখতেই হবে। যদি পরিবারটি সম্পূর্ণ নিরামিষাশী না হয়, তবে সন্তানের ডায়েটে এটি মাস্ট।
৩. ব্লুবেরি ও বেরি জাতীয় ফল—মস্তিষ্কের শক্তিশালী ঢাল:
ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি কিংবা সুস্বাদু কালো জামের মতো ফলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপস্থিত থাকে। এই উপাদানগুলো মস্তিষ্কের অকাল বার্ধক্য বা কোষের অবক্ষয় রোধ করে এবং নতুন কোনো জটিল তথ্য বা বিষয় দ্রুত আয়ত্ত করার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। সাধারণত ছোটো শিশুরা মিষ্টি ফল খেতে দারুণ ভালোবাসে। তাই স্কুলের টিফিনের সময় ওদের এক মুঠো টাটকা ব্লুবেরি অথবা ফ্রেস দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে দিতে পারেন। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের দাবি, নিয়মিত এই ফল খেলে শিশুদের স্মৃতিশক্তি প্রায় কুড়ি শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
৪. মাছ—ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের খনি:
বিশেষ করে রুই, কাতলা, সার্ডিন কিংবা সামুদ্রিক স্যালমন মাছ শিশুর মস্তিষ্কের জন্য অমৃততুল্য। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ডিএইচএ (DHA) এবং ইপিএ (EPA) নামক উপাদান থাকে। এই উপাদানগুলো মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে নিখুঁতভাবে নিজেদের মধ্যে জোড়ার কাজ করে। যার ফলে ব্রেনের ভেতরে যেকোনো তথ্যের আদান-প্রদান অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়। তাই সপ্তাহের অন্তত দুদিন পাতে রাখুন সুস্বাদু মাছের ঝোল বা ভাজা। তবে যদি পরিবারটি নিরামিষাশী হয়, তবে এর চমৎকার বিকল্প হিসেবে ফ্ল্যাক্স সিড (আলিস বীজ) ও চিয়া সিড বেছে নিতে পারেন।
৫. টক দই—পেট ভালো তো মাথা ভালো:
আপনি কি জানেন, আমাদের মানব শরীর বা পেটকেই চিকিৎসকরা ‘দ্বিতীয় ব্রেন’ বলে অভিহিত করেন? টক দইয়ের মধ্যে থাকা প্রচুর পরিমাণে প্রবায়োটিক পেটের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দূর করে পরিপাকতন্ত্রকে একদম ঠিকঠাক রাখে। পেট যদি সবসময় পরিষ্কার ও সুস্থ থাকে, তবে শরীরের ভেতরে পুষ্টির শোষণ খুব ভালো হয় এবং মন-মেজাজ বা মুডও ফুরফুরে থাকে। এর ফলে পড়াশোনায় বাথুনি বা মনোযোগ অনেক সহজে বসে। তাই প্রতিদিন দুপুরের খাবারের পাতে ভাতের সঙ্গে এক বাটি টাটকা টক দই রাখুন। এর সঙ্গে একটু খাঁটি মধু মিশিয়ে দিলে ছোটো সোনারাও অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে খেয়ে নেবে।
মনে রাখুন এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৩টি ছোট্ট টিপস:
১. পর্যাপ্ত জল: আমাদের মোট মস্তিষ্কের প্রায় সত্তর শতাংশই জল দিয়ে গঠিত। শরীরে জলের মাত্রা কমে গেলে মাথা ঝিমঝিম করতে পারে এবং ক্লান্তি আসে। তাই প্রতিদিন অন্তত ছয় থেকে আট গ্লাস জল খাওয়া সবার জন্য মাস্ট।
২. চিনি ও জাংক ফুড বর্জন: অতিরিক্ত চকলেট, প্যাকেটজাত চিপস কিংবা কোল্ড ড্রিঙ্কস শিশুদের মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণ ফোকাস চিরতরে নষ্ট করে দেয়। তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
৩. সঠিক ও সময়মতো ঘুম: প্রতিদিন রাত নটার মধ্যে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকাল সাতটার মধ্যে ঘুম থেকে ওঠা অত্যন্ত জরুরি। মূলত ঘুমের গভীর সময়ই আমাদের ব্রেন সারাদিনের পড়া সুন্দরভাবে গুছিয়ে স্মৃতিতে স্থায়ী করে রাখে।
অতএব, টিউশন কিংবা কোচিংয়ের পেছনে অতিরিক্ত ছোটার পাশাপাশি এবার থেকে সন্তানের খাবারের প্লেটের দিকেও সমানভাবে নজর দিন। বাদাম, ডিম, বেরি জাতীয় ফল, মাছ আর টক দই—এই পাঁচটি সুপারফুড যদি নিয়মিত রোজের ডায়েটে রাখতে পারেন, তবে আপনার শিশুর স্মৃতিশক্তি, প্রখর মনোযোগ এবং আইকিউ তিনটেই এক লাফে বহুগুণ বেড়ে যাবে। পরীক্ষার খাতায় সব পড়া সহজেই মনে পড়বে, আর আপনার সন্তানও হয়ে উঠবে একদম ফেলুদার মতো বুদ্ধিমান।