নিট আন্দোলনে এবার গর্জে উঠলেন অঞ্জন দত্ত! ‘রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু ছাত্রদের দাবি যৌক্তিক,’ কেন এমন বিস্ফোরক মন্তব্য জাতীয় পুরস্কারজয়ীর?

দিল্লির যন্তরমন্তরে চলমান ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বর্তমানে গোটা দেশ জুড়ে চরম রাজনৈতিক উত্তাপ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। শিক্ষাক্ষেত্রে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ তদন্তের জোরালো দাবি এবং আন্দোলনরত পড়ুয়াদের ওপর পুলিশের নির্বিচারে লাঠিচার্জের মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তরজা যেমন তুঙ্গে উঠেছে, তেমনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরাও মুখ খুলতে শুরু করেছেন। বাংলার সাংস্কৃতিক মহল থেকেও একের পর এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই সংবেদনশীল বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছেন। এর আগে অভিনেতা ঋদ্ধি সেন শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আর এবার নিট-কাণ্ডে সরাসরি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছিলেন জাতীয় পুরস্কারজয়ী বিশিষ্ট পরিচালক অঞ্জন দত্ত।

প্রসঙ্গত, মাত্র কয়েকদিন আগেই ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবির সম্মান অর্জন করেছে অঞ্জন দত্ত পরিচালিত জনপ্রিয় ছবি ‘চালচিত্র এখন’। অঞ্জন দত্ত ও তাঁর সুযোগ্য পুত্র নীল দত্তের যৌথ প্রযোজনাতেই এই ছবিটি নির্মিত হয়েছিল। মর্যাদাপূর্ণ সেই জাতীয় পুরস্কার ঘোষণার ঠিক পরেই বাঙালি এই প্রবীণ পরিচালক দেশের অন্যতম আলোচিত ও স্পর্শকাতর এই সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুতে নিজের স্পষ্ট অবস্থান দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।

বুধবার প্রকাশ্যে আসা একটি নতুন ভিডিও বার্তার মাধ্যমে অঞ্জন দত্ত অত্যন্ত সপষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “দিল্লির যন্তরমন্তরে যা ঘটছে এবং শিক্ষার্থীরা যে মৌলিক দাবির পক্ষে দাঁড়িয়ে লড়াই চালাচ্ছে, তা অত্যন্ত যৌক্তিক। আমি একজন মানুষ হিসেবে সবসময় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।” তবে নিজের বক্তব্যের শুরুতেই পরিচালক নিজের রাজনৈতিক পরিচয় বা অবস্থান সম্পর্কে একেবারে স্পষ্ট করে দেন। তাঁর সাফ কথা, তিনি জীবনের কোনো পর্যায়েই কখনোই কোনো ধরনের দলীয় রাজনীতি বা রাজনৈতিক দলের ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা রাখেননি। দলীয় রাজনীতিতে তাঁর বরাবরই জন্মগত অনীহা ছিল। তিনি আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য পদ গ্রহণ করেননি, কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হননি এবং কোনো দলীয় মিছিলেও সশরীরে অংশ নেননি। নিজের ছাত্রজীবন থেকেই এই সমস্ত বিতর্ক থেকে তিনি সর্বদা নিজেকে শতযোজন দূরে রেখে এসেছেন। বর্তমান বয়স ৭৩ বছর উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবনে বহু ঘটনা দেখেছেন, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডায় তাঁর কখনো কোনো বিশ্বাস ছিল না। তিনি সম্পূর্ণভাবে অস্তিত্ববাদে বিশ্বাসী এবং দলীয় সমষ্টির চেয়েও সর্বদা ব্যক্তির স্বাধীন শক্তিতেই বেশি আস্থাশীল।

এরপরই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্বীকার করেন যে আজকের এই সংকটময় প্রেক্ষাপট তাঁকে আর নীরব থাকতে দেয়নি। তাঁর মতে, দিল্লির যন্তর মন্তরে তরুণ ছাত্রছাত্রীরা যে ন্যায়সঙ্গত লড়াই চালাচ্ছে, তা সম্পূর্ণ সমর্থনযোগ্য। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে তিনি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখেন, দেশের পবিত্র সংবিধানকে শ্রদ্ধা করেন এবং আজও সেই সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর বিশ্বাস রাখেন। কিন্তু যখন তিনি দেখেন যে তাঁরই দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ শিক্ষার্থী শিক্ষার মতো একটি অত্যন্ত পবিত্র ও মৌলিক অধিকার নিয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে, শিক্ষাক্ষেত্রে ঘটে চলা তীব্র দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে প্রশ্ন তুলছে এবং সেই সমস্ত আন্দোলন সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও অহিংস উপায়ে পরিচালনা করছে, তখন দেশের একজন প্রবীণ নাগরিক হিসেবে তাঁকে অবশ্যই এই যুবসমাজকে কুর্নিশ জানাতে হয়।

নিজের সেই বিশেষ ভিডিও বার্তার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে আন্দোলনরত সমস্ত ছাত্রছাত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন পরিচালক। তিনি বলেন, আজকের এই তরুণ প্রজন্ম তাঁকে নতুন করে একজন গর্বিত ভারতীয় নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে। এমন একটি স্বাধীন দেশে বাস করতে পেরে তিনি অত্যন্ত গর্বিত, যে দেশের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাক্ষেত্রে ঘটে চলা যেকোনো ধরনের অনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও অহিংস পন্থায় সোচ্চার হতে জানে। অঞ্জন দত্তের এই সাহসী ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কারণ তিনি নিজেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কখনো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, অথচ একইসঙ্গে দেশের সংবিধান ও নির্বাচিত সরকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও পড়ুয়াদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছেন। ফলস্বরূপ, একজন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রবীণ চলচ্চিত্রকারের এমন জোরালো অবস্থান বর্তমান সময়ে নতুন করে তীব্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।