নিজেরই তৈরি করা কড়া নিয়ম ভাঙলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ! একই দিনে বৈঠক করবেন ভারত ও চিন দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে

নেপালের রাজনৈতিক মহলে বর্তমানে এক চাঞ্চল্যকর কূটনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এতদিন পর্যন্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই মুখোমুখি বা একান্ত বৈঠক না করার যে কঠোর নীতি বা নিয়ম প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ নিজেই তৈরি করে রেখেছিলেন, তা এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভাঙতে চলেছেন তিনি। বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে খুব শীঘ্রই এই সপ্তাহে তিনি একযোগে ভারত এবং চিনের শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক দূতদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে চলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জোড়া বৈঠকের মাধ্যমে বালেন শাহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে খুব স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছেন যে, তাঁর প্রশাসনের কাছে নতুন দিল্লি এবং বেজিং—উভয় দেশই সমানভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে কাঠমান্ডু কাউকেই এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে নারাজ।
চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কুর্সি দখল করার পর থেকেই বালেন শাহের প্রশাসনিক জীবন ছিল বেশ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। নিজের ১০০ দিনের সংক্ষিপ্ত কার্যকালের মধ্যেই তাঁকে অন্তত দুটি বড় ধরনের গণ-বিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর মধ্যে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঘটনা ছিল ভারত-নেপাল সীমান্ত এলাকায় নতুন কাস্টম ডিউটি বা শুল্ক আরোপের প্রতিবাদে চলা আন্দোলন, আর অন্যটি ঘটেছিল যখন পুলিশের দমনপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে এক জনৈক রাইড-শেয়ার চালক গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন, যা গোটা দেশে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল। দেশের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর একটি সাম্প্রতিক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বালেন শাহ এই সপ্তাহের মধ্যেই পৃথকভাবে এবং বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভারত ও চিনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করতে চলেছেন। যদিও এই ঐতিহাসিক বৈঠকের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ বা তারিখ এখনও সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়নি, তবে নেপালের বিদেশ মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই বৈঠকগুলো বালেন শাহের প্রশাসনের ১০০ দিন পূর্তির ঠিক পরপরই অনুষ্ঠিত হবে বলে জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
নেপালি সংবাদমাধ্যমের ওই প্রতিবেদনে আরও জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, কাঠমান্ডুর বৈদেশিক নীতিতে যে নয়াদিল্লি এবং বেজিং—উভয় পক্ষই সমান মর্যাদাসম্পন্ন, তা সর্বসমক্ষে প্রমাণ করার জন্যই প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ অত্যন্ত সুকৌশলে একই দিনে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত নবীন শ্রীবাস্তব এবং চিনা রাষ্ট্রদূত ঝাং মাওমিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে নেপালের প্রধানমন্ত্রীরা হয় পুরোপুরি বেজিং-পন্থী অথবা সম্পূর্ণ দিল্লি-পন্থী হিসেবে পরিচিত হয়ে এসেছেন। কিন্তু মার্চ মাসে কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পেছনে থাকা ‘জেন-জি’ (Gen-Z) সমর্থিত ব্যাপক ছাত্র-যুব আন্দোলনের জোয়ারে ভর করে মসনদে বসা বালেন শাহ এতদিন চিরাচরিত এই দ্বিপাক্ষিক রাজনীতির বৃত্ত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। এই কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে গিয়েই তিনি এর আগে একাধিক দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রস্তাব অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
গত কয়েকমাসে তাঁর এই অনমনীয় মনোভাবের জেরে ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি, চিনের বাণিজ্য উপ-মন্ত্রী তথা কমিউনিস্ট পার্টির হেভিওয়েট নেতা ইয়াং ডং, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট সমীর পল কাপুর এবং আমেরিকার বিশেষ দূত সার্জিও গোরের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের অনুরোধ নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাহ। ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, একান্ত বৈঠক এড়িয়ে তিনি এর পরিবর্তে গত এপ্রিল ও মে মাসে কাঠমান্ডুতে নিযুক্ত সমস্ত দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে শুধুমাত্র যৌথ বা দলগত বৈঠক করার নিয়মে অনড় ছিলেন। তাঁর এই দীর্ঘ অনমনীয় কূটনৈতিক নিয়মের একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেছিল চলতি জুলাই মাসের একদম শুরুতে, যখন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সভাপতি মাসাতো কান্ডা তিন দিনের সরকারি সফরে নেপাল সফরে এসেছিলেন এবং বালেন শাহ তাঁর সঙ্গে সৌজন্যমূলক বৈঠক করতে সম্মত হয়েছিলেন।
বালেন শাহের এই একতরফা এবং অভূতপূর্ব শৈলীর কূটনীতি নেপালের অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ, প্রাক্তন আমলা এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল। চলতি বছরের জুন মাসের শুরুর দিকে প্রবীণ সাংবাদিক কেশব প্রধান ‘ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটাল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “যখন ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি গত মে মাসে কাঠমান্ডু সফরের পরিকল্পনা করেছিলেন, তখন অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো বালেন শাহ তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই রাজি হননি। তাঁর অনমনীয় অবস্থান ছিল যে, তিনি বিদেশ মন্ত্রীর পদের নিচের পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তার সঙ্গেই সাক্ষাৎ করবেন না।” এর আগেও তিনি নেপালস্থ ভারতের রাষ্ট্রদূতকেও আলাদা করে সময় দেননি, বরং অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতদের একটি বড় দলের অংশ হিসেবেই সম্মিলিতভাবে সাক্ষাৎ করেছিলেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বালেন শাহের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তন নেপালের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন মোড় আনতে চলেছে।