নাগাল্যান্ডের মুকুটে নতুন পালক! প্রথমবার রেল মানচিত্রে জুড়ছে কোহিমা, কবে থেকে ছুটবে ট্রেন?

উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থার মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁতে চলেছে নাগাল্যান্ড। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিমাপুর (ধনসিরি)–কোহিমা (জুবজা) নতুন রেললাইন প্রকল্পের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের (নির্মাণ) জেনারেল ম্যানেজার আশীস বনসাল নিজে উপস্থিত থেকে এই মেগা প্রকল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক পর্যালোচনা করেন। প্রকল্পের অ্যালাইনমেন্ট, সুড়ঙ্গ নির্মাণ, বড় সেতু, স্টেশন ইয়ার্ড এবং বিভিন্ন জটিল নির্মাণস্থল সরেজমিন ঘুরে দেখেন তিনি।
পরিদর্শনের অংশ হিসেবে জেনারেল ম্যানেজার চলমান কাজের বাস্তব অগ্রগতি খতিয়ে দেখেন এবং মাঠপর্যায়ের আধিকারিক ও ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়ে তিনি গুণমান, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং উৎকর্ষ বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেন। ডিমাপুর (ধনসিরি)–কোহিমা (জুবজা) নতুন রেললাইন প্রকল্পটি উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের অন্যতম প্রধান পরিকাঠামো প্রকল্প। এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের মতো নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা সরাসরি জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে, যা সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
উল্লেখ্য, ৭৮.৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথটি অসমের কার্বি আংলং জেলা এবং নাগাল্যান্ডের চুমুকেডিমা ও কোহিমা জেলার বুক চিরে বিস্তৃত রয়েছে। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে মোট আটটি আধুনিক স্টেশন রয়েছে, যেগুলি হলো—ধনসিরি, ধনসিরিপার, শোখুভি, মোলভম, ফেরিমা, পিফেমা, মেঙ্গুজুমা এবং জুবজা। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ধনসিরি, শোখুভি ও মোলভম স্টেশনের নির্মাণকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বড় এবং কঠিন ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রকল্পে মোট ২০টি সুড়ঙ্গ বা টানেল রয়েছে, যেগুলির সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ৩১,১৬৯ মিটার। পাশাপাশি, নির্মাণ করা হচ্ছে ২৭টি বড় সেতু এবং ১৪৯টি ছোট সেতু, যা প্রকল্পের জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রকল্পটি সামগ্রিকভাবে ধাপে ধাপে সফলতার সঙ্গে চালু করা হচ্ছে। এর প্রথম ধাপে ১৬.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ধনসিরি-শোখুভি অংশটি ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে চালু করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৪.৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ শোখুভি-মোলভম অংশটি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বর্তমানে শোখুভি স্টেশন থেকে গুয়াহাটি এবং নাহরলগুন পর্যন্ত নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেন সফলভাবে চলাচল করছে। মোলভম স্টেশন চালু হওয়ার ফলে নাগাল্যান্ডের রেল পরিষেবার পরিধি আরও বহুগুণ সম্প্রসারিত হয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক পরিস্থিতি এবং অত্যন্ত জটিল ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রকল্পের অবশিষ্ট অংশের নির্মাণকাজ বর্তমানে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। একাধিক সুড়ঙ্গে একইসঙ্গে দিনরাত কাজ চলছে এবং আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি ও ধারাবাহিক কড়া নজরদারির মাধ্যমে প্রকল্পটিকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
পরিদর্শন শেষে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার আশীস বনসাল এই মহাপরিকল্পনায় যুক্ত সমস্ত প্রকৌশলী, ইঞ্জিনিয়ার ও নির্মাণকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে সমস্ত পক্ষের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে প্রকল্পের কাজে নিরাপত্তা এবং গুণগত মানে কোনও অবস্থাতেই যেন আপস করা না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছেন তিনি। নাগাল্যান্ডবাসীর বহুদিনের স্বপ্নপূরণে এই রেল প্রকল্প এখন শেষ পর্যায়ে।