কলেজ জীবন থেকেই স্বপ্ন ছিল নিজের একটা রেস্তোরাঁ খোলার। সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায় তিল তিল করে টাকা জমিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে দুর্গাপুরের সিটি সেন্টার এলাকায় তাঁর সেই সাধের রেস্তোরাঁটি যাত্রা শুরু করে। ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে নাম দিয়েছিলেন ‘নবান্ন’। কিন্তু তখন তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে, এই নামটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর প্রশাসনিক সচিবালয়ের নাম ‘নবান্ন’ রাখা হয়। আর সেই নামের অধিকার নিয়েই শুরু হয় সুপ্রিয়বাবুর চরম দুর্দিন।
আইনত সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায় ২০০৯ সালের ৪ মার্চ ‘নবান্ন’ নামটি ট্রেডমার্ক করিয়েছিলেন। দীর্ঘ বছর ধরে ব্যবসার উন্নতির পাশাপাশি তাঁর এই নামটি দুর্গাপুরের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গাপুর পুরসভায় একটি নির্দেশিকা পাঠানো হয়। সেখানে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘নবান্ন’ এবং ‘উত্তরকন্যা’—এই দুটি নাম কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি ফরমান অনুযায়ী, সুপ্রিয়বাবুকে তাঁর রেস্তোরাঁর নাম পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়।
হঠাৎ নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায় কার্যত ভেঙে পড়েন। তাঁর কথায়, “ব্যবসা নিজের সন্তানের মতো। কত কষ্ট করে তিল তিল করে বড় করেছিলাম। কিন্তু সরকারি নির্দেশের সামনে এক ধাক্কায় সব ওলটপালট হয়ে গেল।” শুধু নাম পরিবর্তন নয়, ‘নবান্ন’ নাম খোদাই করা সমস্ত দামি প্লেট, বাসনপত্র, কর্মীদের পোশাক এবং সাইনবোর্ড—সবই বাতিল করতে হয় তাঁকে। নাম বদল করে তিনি নতুন নাম রাখেন ‘পার্বণ’। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর আর্থিক লোকসান হয়েছিল প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা।
২০১৭ সালে ‘পার্বণ’ নামে নতুন করে যাত্রা শুরু করলেও পুরনো সেই ক্ষত আজও টাটকা। সুপ্রিয়বাবু জানান, সেই সময় সরকারের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে জড়ানোর মতো মানসিক বা আর্থিক অবস্থা তাঁর ছিল না। সরকারের সঙ্গে ‘পাঙ্গা’ নেওয়া যে সাধারণ ব্যবসায়ীর পক্ষে কতটা কঠিন, তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। আজ সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে আজও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। নিজের স্বপ্নের প্রকল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে তাঁকে যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে, তা আজও দুর্গাপুরের অনেক ব্যবসায়ীর কাছে একটি বেদনার নজির হয়ে আছে। প্রশাসনিক শক্তির দাপটে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর স্বপ্নের বলি হওয়ার এই কাহিনী আজও অনেকের মনে প্রশ্ন তোলে—ব্যবসায়িক স্বত্ব এবং সরকারি সিদ্ধান্তের এই দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষের আবেগের দাম কি সত্যিই কিছুই নেই?





