ধ্বংসস্তূপের নিচে ১৯২ ঘণ্টা! ভেনেজুয়েলায় অলৌকিক ভাবে জীবিত উদ্ধার ৪৩ বছরের ব্যক্তি

মানুষের বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং অদম্য মানসিকতার কাছে মাঝে মাঝে বিজ্ঞানের সব হিসাব-নিকাশ হার মানে। ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থাকল ভেনেজুয়েলা। গত ২৪ জুন দেশটির উত্তরাঞ্চলে আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপে টানা আট দিন অর্থাৎ ১৯২ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকা থাকার পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৪৩ বছর বয়সী নিরাপত্তা রক্ষী এরনান আলবার্তো জিল ফ্লোরেসকে। ধ্বংসস্তূপের নিচে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার এই ঘটনা এখন সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার দিন লা গুয়াইরা রাজ্যের একটি বহুতল শপিং সেন্টারে নাইট ডিউটিতে ছিলেন এরনান। ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পে যখন পুরো ভবনটি ধসে পড়ে, তখন তিনি একটি ছোট সিকিউরিটি কেবিনে ছিলেন। শপিং সেন্টারের প্রায় ১৪০ টন ভাঙা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েও ভাগ্যক্রমে তাঁর কেবিনটি অক্ষত থেকে যায়। কেবিনের ভেতরে তৈরি হওয়া একটি ছোট এয়ার পকেটেই তিনি দীর্ঘ আট দিন অক্সিজেনের জোগান পেয়েছেন। সাধারণ যেকোনো দুর্যোগে প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময়কে জীবিত উদ্ধারের জন্য ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় মনে করা হয়। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও এরনানের বেঁচে থাকার সংকেত পেয়ে উদ্ধারকারীরা নতুন উদ্যমে কাজে নামেন।
কোস্টারিকান রেড ক্রসের একটি বিশেষ দল রবিবারের দিকে প্রথম তাঁর বেঁচে থাকার সংকেত পায়। এরপর চিলির দমকল বাহিনীর চৌকস দল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, পর্তুগাল ও স্থানীয় উদ্ধারকারীদের নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্স শুরু করে ইতিহাসের অন্যতম জটিল উদ্ধার অভিযান। অত্যাধুনিক টেলিস্কোপিক ক্যামেরার সাহায্যে সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ দিয়ে এরনানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা হয়। শেষ তিন দিন নিখুঁত পরিকল্পনায় একটি সরু পাইপ দিয়ে তাঁকে গ্লুকোজ ও তরল পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হয়। চিলির অভিজ্ঞ দমকলকর্মী ক্যাম্পোস ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে অনবরত এরনানের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রেখেছিলেন।
উদ্ধারের আগের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সুড়ঙ্গের অন্ধকারে বসে এরনান শান্তভাবে ছবি আঁকছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে তাঁকে বের করে আনার মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। ধুলোবালিতে ধূসর এবং অক্সিজেন মাস্ক পরা এরনানকে যখন স্ট্রেচারে করে বাইরে বের করা হয়, তখন সেখানে উপস্থিত স্বেচ্ছাসেবীদের চোখে আনন্দের অশ্রু দেখা গেছে। এরনানের স্ত্রী গুসবিমার গঞ্জালেস স্বামীর এই অলৌকিক প্রত্যাবর্তনে উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, এতদিন তিনি গভীর হতাশায় ডুবে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের আশীর্বাদে স্বামীকে ফিরে পেয়েছেন। ভেনেজুয়েলার এই ভয়াবহ দুর্যোগে ইতিমধ্যেই আড়াই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, এমন শোকের আবহে এরনানের ফিরে আসা এক চিলতে আলোর দিশা হিসেবে দেখছেন ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ ও উদ্ধারকর্মীরা। এই উদ্ধার অভিযান প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক সংহতি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঠিক ব্যবহারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেলে অলৌকিক জয় সম্ভব।